প্রায় ৯ মাস ধরে আরাকান আর্মির হাতে আটক স্বামী। এর মধ্যে সন্তানের জন্ম হয়েছে। স্বামী না থাকায় কী নিদারুণ কষ্টে আছেন, সেই বর্ণনা দিলেন সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা সানজিদা আক্তার। আজ রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন–সংলগ্ন বটতলায়
প্রায় ৯ মাস ধরে আরাকান আর্মির হাতে আটক স্বামী। এর মধ্যে সন্তানের জন্ম হয়েছে। স্বামী না থাকায় কী নিদারুণ কষ্টে আছেন, সেই বর্ণনা দিলেন সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা সানজিদা আক্তার। আজ রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন–সংলগ্ন বটতলায়

আরাকান আর্মির হাতে বন্দী স্বামীর মুক্তি চান সানজিদা

জন্মের পর সন্তান বাবাকে দেখেনি, বাবাও সন্তানের মুখ দেখতে পাননি

‘আমার স্বামীকে যেদিন মিয়ানমারের আরাকান আর্মির সদস্যরা আটক করে নিয়ে যায়, সেদিন রাতেই আমাদের সন্তান পৃথিবীতে আসে; কিন্তু এখনো সে তার বাবাকে দেখতে পারেনি; আর আমার স্বামীও নিজের সন্তানকে একবারও দেখতে পারেননি। আমি সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি, যত দ্রুত সম্ভব আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনা হোক।’ কথাগুলো বলছিলেন সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা সানজিদা আক্তার।

গত বছরের আগস্ট মাসে সানজিদার স্বামী আবদুল্লাহ মাছ ধরতে বঙ্গোপসাগরে গেলে তাঁকেসহ কয়েকজন বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে যান আরাকান আর্মির সদস্যরা। ওই জেলেরা এখনো ছাড়া পাননি। সে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন চার সন্তানের জননী সানজিদা আক্তার।

আজ রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন–সংলগ্ন বটতলায় ‘হাঁর হঁমতা, হাঁর হঁশট’ (কার ক্ষমতা, কার কষ্ট) শীর্ষক উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষের আলোচনায় এসব কথা বলেন সানজিদা। মিয়ানমার ও জলসীমান্তের বাস্তবতা তুলে আনতে এ ক্লাসের আয়োজন করে ‘সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স’ নামের একটি সংগঠন। সেখানে যোগ দিয়ে নিজেদের কষ্টের কথা জানাতে সেন্ট মার্টিন থেকে ঢাকায় আসেন কয়েকজন ভুক্তভোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। সানজিদা আক্তার তাঁদের সঙ্গে আসেন।

উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষে শুরুতে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনপরিসরে যাঁদের ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাঁদের কণ্ঠস্বর খুব কমই মূলধারায় জায়গা পায়। প্রতিনিধিত্বের সংকট, জ্ঞানগত দমন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা সরাসরি সমাজের সামনে আসে না; বরং তা বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর ব্যাখ্যার মাধ্যমে পৌঁছায়। এ কারণে অনেক সময় প্রকৃত অভিজ্ঞতা হারিয়ে যায়।

তানজীমউদ্দিন খান বলেন, ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনীতিতে যত আলোচনা হয়, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাংলাদেশের বিশাল জলসীমান্ত ও সেখানে বসবাসকারী মানুষের বাস্তবতা ততটা গুরুত্ব পায় না। তিনি বলেন, ১৯৮২ সালের আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার জলসীমায় সার্বভৌমত্ব রয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, আরাকান আর্মির উত্থান, রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মিলিয়ে নতুন এক জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সেন্ট মার্টিন ও উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায় জীবিকা ও নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই গভীর সংকটের মুখে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এই বাস্তবতা বোঝার জন্য প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতাকে সামনে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই অধ্যাপক। রাষ্ট্রের করণীয় নির্ধারণে তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জলসীমান্তের নতুন বাস্তবতায় প্রান্তিক মানুষের ভাষা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে জ্ঞানচর্চার মূলধারায় যুক্ত করতে পারলে ভবিষ্যতে নানা সংকটের সমাধানে কার্যকর পথ তৈরি হতে পারে।

‘হাঁর হঁমতা, হাঁর হঁশট’ (কার ক্ষমতা, কার কষ্ট) শীর্ষক উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষের আলোচনায় কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান। আজ রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন–সংলগ্ন বটতলায়

‘নির্যাতনে মনে হতো, আর বুঝি বাঁচব না’

উন্মুক্ত এই আয়োজনে মিয়ানমারের আরাকান আর্মির হাতে আটক হয়ে চার মাস বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন সেন্ট মার্টিনের জেলে মো. আমিন। তিনি বলেন, তাঁদের বাংলাদেশের জলসীমার ভেতর থেকেই ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর চোখ–হাত বেঁধে মারধর, না খাইয়ে রাখা, জোর করে কাজ করানো এবং অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

মো. আমিন বলেন, ‘একেকটা দিন আমাদের কাছে এক বছরের মতো মনে হতো। লাথি মেরে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে, কান্না করলেও আরও মারত। খাবার না দিয়ে কাজ করিয়েছে, ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, বন্দিশিবিরে তাঁদের বলা হয়েছিল, তোমাদের ১০ বছর জেল হয়েছে। পরে তাঁদের একটি কারাগারে নেওয়া হয়, যেখানে অমানবিক পরিবেশে শতাধিক বন্দীকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। মো. আমিন বলেন, ‘আমরা এককাপড়ে চার মাস কাটিয়েছি। শীত, ক্ষুধা আর নির্যাতনের মধ্যে প্রতিদিন মনে হতো; আর বুঝি বাঁচব না।’

আরাকান আর্মির হাতে আটক বাবা নূর মোহাম্মদের মুক্তির জন্য সরকারের সহায়তা চাইতে ঢাকায় আসেন তাঁর মেয়ে ইয়াসমিন আক্তার সুমাইয়া। তিনি বলেন, ‘আমার বাবাকে বাংলাদেশের জলসীমা থেকে আটক করা হয়েছে; কিন্তু আমরা শুধু তারিখের পর তারিখ শুনেছি—এই দিন আসবে, ওই দিন আসবে। এখন পর্যন্ত তাঁকে ফিরে পাইনি।’ বাবার মুক্তি চেয়ে ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ‘আমরা কিছু চাই না, শুধু আমাদের বাবাদের আমাদের বুকে ফিরিয়ে দিন। কোনো দোষ না করেও তাঁরা আরাকান আর্মির হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।’ একই দাবি জানান সেন্ট মার্টিনের আরেক বাসিন্দা জিল্লুর রহমান, যাঁর বাবা এখনো আরাকান আর্মির হাতে আটক রয়েছেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিসিডির প্রদায়ক শামসুল আরিফ ফাহিম। আলোচনাধর্মী ক্লাসটিতে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শৈলী আখন্দ ও সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দা জামির উদ্দিন।