
মা–বাবার সঙ্গে বইমেলায় এসেছে দুই বোন তন্ময়ী ও মৃন্ময়ী। দুজনেই স্টলে বই দেখছে। আট বছর বয়সী তন্ময়ী দেখছিল গল্পের বই, আর তিন বছরের ছোট্ট মৃন্ময়ী খুঁজছিল ছবি আঁকার বই। অনেকক্ষণ বাছাই করে তন্ময়ী কিনল ‘পঞ্চভূতের ছড়া’ নামের বইটি।
তন্ময়ী ও মৃন্ময়ীর বাবা বিশ্বজিৎ দত্ত একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘ওরা মেলায় আসতে খুবই উদগ্রীব ছিল। পাপেট শো দেখবে। আমি তখনো ঘুম থেকে উঠিনি, অথচ ওরা তৈরি হয়ে বসে ছিল। শুধু সপ্তাহে দুদিন নয়; বাচ্চারা যেতে পারে, আনন্দ করতে পারে—এমন আয়োজন বইমেলায় বছর জুড়েই থাকা উচিত।’
মেলায় শুধু তন্ময়ী-মৃন্ময়ীই নয়; এসেছে অনুগল্পজয়ী, আলিনা, ফারুক, ইপশিতা, আদৃকা রায়সহ অনেক শিশু। কেউ এসেছে মা–বাবার সঙ্গে, কেউ দাদুর সঙ্গে, আবার কেউ পিসির সঙ্গে। শিশুদের অনেকেই প্রথমবারের মতো মেলায় এসেছে, কেউ–বা আসে নিয়মিত। তবে সবার চোখেই ছিল কৌতূহল।
আজ শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার চতুর্থ শিশুপ্রহরে গিয়ে দেখা পাওয়া গেল এই শিশুদের।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন হয়। পবিত্র রমজান মাসের কারণে এ বছর মেলার সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। প্রতিদিন বেলা দুইটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মেলা চলছে। তবে শুক্র ও শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে থাকছে শিশুপ্রহর। এদিন মেলা শুরু হয় বেলা ১১টায়; আর শিশুপ্রহর চলে বেলা ১টা পর্যন্ত। এরপর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য মেলা খোলা থাকে। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত গ্রন্থানুরাগীরা মেলায় ঢুকতে পারেন।
এবারের বইমেলায় পাপেট শো প্রদর্শন করছে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার। শিশুদের মধ্যে এটি বেশ সাড়া ফেলেছে। বেলা ১১টায় গিয়ে দেখা গেল, শিশুরা পাটির ওপর বসে অপেক্ষা করছে। একেবারে সামনের সারিতে বসে আছে জোহান, অনুগল্পজয়ী, ওমর আর মোহসামা। ওমর বলল, ‘এই পুতুলনাচ মোবাইলে দেখেছি। আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই এখানে দেখতে এসেছি।’
এর মধ্যেই গান বেজে উঠল, ‘চলো আমরা বই পড়ি, বইয়ের রাজ্যে ভেসে ভেসে স্বপ্নদেশের জাল বুনি...’। গান শুনে চারপাশ থেকে সব শিশু ছুটে আসে। পাপেট চরিত্র ‘ব্লু’ এবং ‘আলো’ শিশুদের স্বাগত জানায়। ব্লু শিশুদের জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমরা কি দেশকে ভালোবাসো?’ শিশুরা সমস্বরে চিৎকার করে জানায়, ‘ভালোবাসি...’।
শুরু হয় পাপেট শো ‘বন ভ্রমণ’। শোতে শিশুদের গল্প বলে পাপেট চরিত্র ঐশ্বর্য, ঐতিহ্য এবং ইতু। একে একে আসে মায়াহরিণ, গাছ ও হালুম। গল্পের ছলে শিশুদের বোঝানো হয়, প্লাস্টিক দিয়ে পরিবেশ দূষণ করা যাবে না। গাছ কাটা যাবে না, বন রক্ষা করতে হবে। গল্প এগিয়ে চলে, আর শিশুরা মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে। কখনো হাততালি, কখনো চিৎকার, আবার কখনো গানে মুখর থাকে পুরো সময়। ‘আমরা সবাই রাজা...’ গান দিয়ে শেষ হয় পাপেট শো।
পাপেট শোর পর আয়োজন করা হয় গল্পপাঠের আসর। এতে শিশুদের গল্প পড়ে শোনান রেফায়েত আরা। তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের ‘তুমি কেন ঘষো আমি তাহা জানি’ গল্পটি তিনি শিশুদের শোনান। গল্পপাঠের আসরে শিশুদের নানা প্রশ্ন করা হয়। যেমন ‘বলো তো রাখাল কী?’, ‘মন্ত্রটা কে কে বলতে পারবে?’ শিশুরা চিৎকার করে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেয়। শিশুরাও গল্পকথককে নানা প্রশ্ন করে। একজন শিশু উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘দুষ্টু লোক যদি আমার পিছু পিছু ঘোরে, আমি বলব—তুমি কেন ঘোরো, আমি তাহা জানি।’ গল্পকথক শিশুটিকে উৎসাহ দিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ! তাহলে দুষ্টু লোকটা পালিয়ে যাবে।’ শিশুদের উৎসাহ দেখে শোয়ের সংখ্যা বাড়িয়েছেন আয়োজকেরা। এখন প্রতি শো শেষে এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে রাত আটটা পর্যন্ত চলে এ আয়োজন।
অন্যদিকে ‘এই বায়োস্কোপ, বায়োস্কোপ’—দয়াল চন্দ্রের হাঁক শুনে শিশুরা বায়োস্কোপের সামনে জড়ো হতে থাকে। দয়াল কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের সদস্য। বায়োস্কোপে দেখানো হচ্ছে ‘কুঁজো বুড়ির গল্প’। বাক্সে চোখ লাগিয়ে বায়োস্কোপ দেখছে ওজিহা, সারা ও প্রিনন্তী। ওজিহা আর সারা এসেছে দাদুর সঙ্গে। বায়োস্কোপে কী ঘটছে, একটু পরপর চোখ উঠিয়ে দাদুকে বলছিল ওজিহা, ‘দাদু, দেখো, বুড়ি মা, বুড়ি মা!’ দাদা মোস্তফা জামাল ব্যস্ত হয়ে বলছিলেন, ‘উঠো না দাদু, দেখতে থাকো, দেখো।’
পুরো পরিবার নিয়ে মেলায় এসেছে আট বছর বয়সী প্রিয়ন্তী। বায়োস্কোপ শেষে মাকে গল্প শোনাচ্ছিল সে, ‘ওইখানে আছে কুঁজো বুড়ি, তার দুটো কুকুর ছিল। ওই দুটো কুকুর শিয়ালের হাত থেকে কুঁজো বুড়িকে বাঁচিয়েছে। তারপর গল্প শেষ।’ মা লতা চট্টোপাধ্যায় জানান, তিন–চার বছর বয়স থেকেই মেলায় আসে প্রিয়ন্তী। ছবি আঁকতে ভালোবাসে সে। প্রতিবার মেলা থেকে সাত–আটটি ছবি আঁকার বই কিনে দিতে হয় তাকে। প্রিয়ন্তী বলে, ‘ড্রয়িং ভালো লাগে। আমি গল্পের বইও পড়ি। আমার প্রিয় সায়েন্স ফিকশন, ভূতের গল্প আর ছবি আঁকার বই।’ প্রথমবারের মতো বায়োস্কোপ দেখে উচ্ছ্বসিত সে।
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই শোর মাধ্যমে আমরা শিশুদের বই পড়তে উৎসাহিত করতে চাচ্ছি, যাতে তাদের সৃজনশীল বিকাশ ঘটে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে শিশুরা যেন মোবাইল থেকে দূরে থাকে। তারা যেন বই পড়ে, মাঠে খেলে।’