
সীমান্তে পুশ ইন নিয়ে উত্তেজনা চলার মধ্যে এবার দিল্লিতে সীমান্ত সম্মেলনে বসেছিল বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ। আলোচনায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পক্ষ থেকে পুশ ইন বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। বিজিবি জানিয়েছে, এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)।
৮ জুন ভারতের রাজধানীতে বিজিবি ও বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়েছিল। এতে বিজিবির পক্ষে নেতৃত্ব দেন বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। অন্য পক্ষে নেতৃত্বে ছিলেন বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার।
এই সীমান্ত সম্মেলনের আগে মাস খানেক ধরে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্নজনকে পুশ ইনের চেষ্টা করছে ভারত। এ নিয়ে বিভিন্ন সীমান্তে উত্তেজনা চলছে। বিজিবির পাশাপাশি সীমান্তবাসী বাংলাদেশিরাও সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুশ ইন বন্ধে এরই মধ্যে নয়া দিল্লিতে কয়েকটি চিঠি পাঠিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সীমান্ত সম্মেলনে শেষে আজ শুক্রবার বিজিবির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারাও বৈঠকে বিষয়টি তুলেছে।
এতে বলা হয়, বিজিবির মহাপরিচালক বিএসএফ কর্তৃক রোহিঙ্গা/মিয়ানমার নাগরিকসহ ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পুশ ইন ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা সীমান্তবিষয়ক যৌথ নির্দেশিকা, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, পূর্ববর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত পারস্পরিক সিদ্ধান্তসমূহ এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক নীতি ও প্রটোকলের পরিপন্থী।
ভারতে অবৈধ কেউ যদি যাচাইয়ের পর বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে তাকে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে বলে বিএসএফকে জানিয়েছেন বিজিবির মহাপরিচালক। তিনি বিএসএফ মহাপরিচালককে এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করার এবং বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের জন্য বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া ও প্রটোকল অনুসরণের আহ্বান জানান।
বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সব অনিষ্পন্ন জাতীয়তা যাচাইকরণ বিষয় দ্রুত সম্পন্ন করার এবং তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান বলে বিজিবির বিবৃতিতে জানানো হয়।
এতে আরও বলা হয়, উভয় পক্ষই সম্মত হয় যে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গৃহীত পদ্ধতি ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা উচিত।
সম্মেলনে সীমান্তে হত্যা ও সহিংসতা প্রতিরোধ, সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও চোরাচালান, অবৈধ অভিবাসন, মানব পাচার, জাল মুদ্রা ও স্বর্ণ চোরাচালান, পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম এবং অননুমোদিত নির্মাণ ও সীমান্ত অবকাঠামোসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিজিবির বিবৃতিতে বলা হয়, মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সীমান্তে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় নাগরিকদের দ্বারা প্রাণঘাতী ও অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে নিরস্ত্র ও নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ উল্লেখ করে সীমান্ত এলাকায় হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য বিএসএফ ডিজিকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বিজিবির ডিজি ভারতের মিজোরাম রাজ্যে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ভারতের সহযোগিতা কামনা করেন।
সম্মেলনে বিজিবির ডিজি পূর্ববর্তী আশ্বাস সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট বেড়া (এসআরএফ), গবাদিপশুর বেড়া এবং অন্যান্য কাঠামোর নির্মাণ অব্যাহত থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ১৯৭৫ সালের ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত কর্তৃপক্ষ সংক্রান্ত নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান।
অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বিজিবির ডিজি বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলি, ধর্মীয় বর্ণনা, রাজনৈতিক বিষয় এবং সীমান্ত-সম্পর্কিত বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে কিছু নির্দিষ্ট প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা ও বিকৃত সংবাদ, গুজব এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বলে বিবৃতিতে বলা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিএসএফ ডিজির বাংলাদেশি নাগরিকদের অবৈধ অভিবাসন এবং রোহিঙ্গা অবৈধ অভিবাসীদের ভারতে প্রবেশ-সংক্রান্ত উদ্বেগের জবাবে বিজিবির ডিজি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিকট সুপরিচিত। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উদ্বেগের বিষয়। বিজিবি ডিজি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা বা মিয়ানমারের নাগরিকদের তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতে অবৈধভাবে চলাচলের অনুমতি দেয় না।
শান্তির রক্ষার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত: বিএসএফ
এদিকে সীমান্ত সম্মেলন শেষে বিএসএফ প্রচারিত এক যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আলোচনায় উভয় পক্ষ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। তারা সমন্বিত টহল আরও জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি, তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো এবং আন্তসীমান্ত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ প্রচেষ্টা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।
বিএসএফ জানিয়েছে, মাদক, অস্ত্র, জাল টাকা, সোনা ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রী চোরাচালানসহ আন্তসীমান্ত অপরাধ কার্যকরভাবে প্রতিরোধের পাশাপাশি অবৈধ সীমান্ত পারাপার ও মানব পাচার রোধে সম্মেলনে উভয় পক্ষ বিস্তারিত আলোচনা করেছে।
দুই দেশের প্রতিনিধিদল সীমান্ত হত্যা এবং সীমান্ত এলাকায় অবৈধ, অসতর্কতাবশত বা জোরপূর্বক সীমান্ত পারাপার সম্পর্কিত বিষয়াবলি, সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপ এবং সীমান্তে নতুন করে সৃষ্ট নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা করেছে বলে বিএসএফের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া উভয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী আন্তসীমান্ত অপরাধ, বিদ্রোহী কার্যকলাপ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ডের প্রতি শূন্য সহনশীলতার (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণের যৌথ সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেছে বলেও বিএসএফের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, উভয় প্রতিনিধিদল চলতি বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজনের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে।