দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অর্থবহ নির্বাচনের সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে একধরনের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহ তৈরি করেছে। মানুষ যেভাবে বাড়ির দিকে ছুটছে এবং ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়, দেশের মানুষ ভোট দিতে চায়। তারা ভোটের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নিতে আগ্রহী।
সার্বিকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে, সাধারণ জনগণ ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে নানা কৌশল ও মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য এটি একটি ভালো লক্ষণ বলেই মনে হয়।
পাশাপাশি এটিও সত্য যে এবারের নির্বাচনকে একেবারে আদর্শ বলা যাবে না। কিছু কিছু জায়গায় সহিংসতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যা না ঘটাই কাম্য ছিল। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সক্ষমতা, সামর্থ্য ও গত কয়েক মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—ভোটের মাঠে সহিংসতা এখনো এমন কোনো উদ্বেগজনক মাত্রা ছাড়ায়নি। সাধারণভাবে মানুষ ভোটের বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছে।
আমরা আশা করতে পারি, আজকের দিনটি ভালো যাবে। প্রত্যাশা থাকবে—সব বড় রাজনৈতিক দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তি দায়িত্বশীল আচরণ করবে এবং তাদের তৃণমূলের প্রার্থী ও কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবে।
তবে বাস্তবতা হলো, ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে, আবার জামায়াত জোটের পাশাপাশি দলীয় প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয় আছে। এসব এলাকায় কিছু সংঘাত বা অস্থিরতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবু যদি সব দলের সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার সদিচ্ছা সত্যিকার অর্থে থাকে, তাহলে দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, সরকারের সতর্কতা এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকার সমন্বয়ে এবারের ভোট সফলভাবে সম্পন্ন হবে বলেই আশা করা যায়।
একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা খুবই সাধারণ—আমরা যেন নির্বিঘ্নে আমাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারি। সহিংসতা যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে এবারের নির্বাচনে বড় পরিসরে মানুষের অংশগ্রহণ হবে বলেই আমার ধারণা।
নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা আরও গভীর ও বহুমাত্রিক। আজ বাংলাদেশের সমাজ বিভক্ত—দলমত, মতাদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সমাজ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছে। এই বিভাজন দূর করে জাতি হিসেবে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও মতাদর্শ নির্বিশেষে—সবার জন্য সমানভাবে বাসযোগ্য একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য।
একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ অত্যন্ত বড়। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া লুটপাট ও দুর্নীতির ফলে অর্থনীতিতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে দেশকে বের করে আনা জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধ করার যে চর্চা ছিল, সরকার পরিবর্তনের পর তার উল্টো প্রতিক্রিয়া হিসেবে একধরনের অসহিষ্ণুতা আমরা লক্ষ করেছি—যেন এবার এক পক্ষই শুধু কথা বলবে। এই প্রবণতার অবসান ঘটানো জরুরি।
নতুন সরকারের দায়িত্ব হবে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে আশ্রয় দেওয়া, সবার মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও শ্রেণিভেদ না করে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। সর্বোপরি একটি কার্যকর ও টেকসই সুশাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।