শতবর্ষী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা সংস্থা থেকে কতটি বই প্রকাশিত হওয়া স্বাভাবিক?—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মিলেছে বিস্ময়কর তথ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা থেকে এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে মাত্র ১৮৮টি বই। এর মধ্যে অনেক বইয়ের মূল কপি সংরক্ষিত নেই, অনেকগুলো নেই পাঠকের নাগালে।
দীর্ঘ ও জটিল প্রকাশনা প্রক্রিয়া, দুর্বল বিপণন ও সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়েছে এই সংস্থাটি। শিক্ষক-গবেষকেরাও এই সংস্থা থেকে বই প্রকাশে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থার গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত হয় ১৯৮৭ সালে। আর প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৩ সালে। এর আগে প্রকাশিত বইগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের অধীনে বের হয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা থেকে বছরে গড়ে মাত্র দুই থেকে তিনটি বই প্রকাশিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রকাশনার হার আরও কমে এসেছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে মাত্র একটি বই, ২০২২ সালে দুটি। ২০২১ সালে কোনো বই প্রকাশই হয়নি, আর ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছে একটি মাত্র বই।
শতবর্ষী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এ সংখ্যাকে ‘একেবারেই নগণ্য’ বলে মন্তব্য করছেন শিক্ষাবিদেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তার প্রকাশনার মাধ্যমেই চেনা যায়। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ওপরে ওঠার জন্য গবেষণার পাশাপাশি প্রকাশনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তার প্রকাশনার মাধ্যমেই চেনা যায়। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ওপরে ওঠার জন্য গবেষণার পাশাপাশি প্রকাশনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।—সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ব্রিটিশ আমলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যুক্তরাজ্যের সেই অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রেস থেকে বছরে গড়ে ৬ হাজারের বেশি বই প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কম হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক তারিক মনজুর। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেন তিনি। প্রথমত, এখানে মূলত গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হয়; সব ধরনের বই প্রকাশের সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, প্রকাশনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। তৃতীয়ত, শিক্ষক-গবেষকদের কাছে সংস্থাটিকে জনপ্রিয় করা যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা থেকে বই প্রকাশ করতে গিয়ে লেখকদের পড়তে হয় দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার মুখে। পাণ্ডুলিপির তিনটি মুদ্রিত কপি ও একটি সফট কপি জমা দেওয়ার পর উপাচার্য, ডিনসহ পরিচালনা পরিষদের সভায় প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই সভা আহ্বান করতেই অনেক সময় লেগে যায়।
সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে—মোট ৪৮টি। এই দশকেও ৩০টি ইংরেজি বইয়ের বিপরীতে ১৮টি বাংলা বই প্রকাশিত হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ২৮টি বইয়ের মধ্যে ১৮টি ইংরেজি ও ১০টি বাংলা বই প্রকাশিত হয়। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশিত ৩১টি বইয়ের মধ্যে ১৬টি ছিল ইংরেজি এবং ১৫টি বাংলা। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৩২টি বইয়ের মধ্যে ১৭টি ইংরেজি এবং ১৫টি বাংলা।
প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হলে পাণ্ডুলিপি পাঠানো হয় দুজন বিশেষজ্ঞের কাছে। উভয়ের অনুমোদন পেলে বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়। একজন বাতিল করলে তৃতীয় বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়। তিনিও বাতিল করলে পাণ্ডুলিপিটি স্থায়ীভাবে বাতিল হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞের মতামতের পর লেখককে সংশোধনের জন্য আবার পাণ্ডুলিপি পাঠানো হয়। এরপর সম্পাদনা ও প্রকাশ—প্রতিটি ধাপেই সময় বাড়তে থাকে।
অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, ‘পুরো কাজে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। এ ছাড়া এখান থেকে প্রকাশিত বইয়ের প্রচারও কম থাকে। এ কারণে লেখক-গবেষকেরা এখান থেকে বই প্রকাশে আগ্রহী হন না। অনেকে অন্য প্রকাশনা থেকে বই প্রকাশ করেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি বিপণন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার বই, সাময়িকী ও স্মারক থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থার বইয়ের উপস্থিতি খুবই কম।
বিপণন বিভাগের সহকারী পরিচালক পরিমল চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থার বই মূলত গবেষণা ও একাডেমিক হওয়ায় বিক্রি তুলনামূলক কম।
অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা এই প্রকাশনা সংস্থা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। তাই এর প্রচার কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
পুরো কাজে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। এ ছাড়া এখান থেকে প্রকাশিত বইয়ের প্রচারও কম থাকে। এ কারণে লেখক-গবেষকেরা এখান থেকে বই প্রকাশে আগ্রহী হন না। অনেকে অন্য প্রকাশনা থেকে বই প্রকাশ করেন।—তারিক মনজুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও অধ্যাপক
প্রকাশনা সংস্থাকে গতিশীল করতে গঠনতন্ত্রে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন অধ্যাপক তারিক মনজুর। তাঁর মতে, বইয়ের প্রাথমিক বাছাই ও অনুমোদনের জন্য বিভিন্ন অনুষদের পাঁচ-ছয়জন শিক্ষক নিয়ে পাণ্ডুলিপি বাছাই কমিটি করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সব পত্রিকা ও প্রকাশনাকে এই সংস্থার অধীনে আনা এবং মুদ্রণযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণও একীভূত করার প্রস্তাব দেন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাথমিকভাবে সংস্থার ওয়েবসাইটে সব বই ও স্যুভেনিরের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন জানিয়ে প্রকাশনা সংস্থার এই ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বলেন, টিএসসির কাছে একটি ডাকবাংলোকে গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। এটিকে সংস্কার করে প্রকাশনা সংস্থার আধুনিক বিক্রয়কেন্দ্র বানানো যেতে পারে। সেখানে শিক্ষার্থীরা বই কেনার পাশাপাশি বসে চা খেতে খেতে বই পড়ার সুযোগও পাবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মুদ্রণযন্ত্র থাকলেও তা আধুনিক নয়। এখানে মূলত জার্নাল, স্মারক, লিফলেট, পোস্টার, প্রশ্নপত্র ও খাতা ছাপানো হয়। এ কারণে এখান থেকে সব বই প্রকাশ করা সম্ভব হয় না।
মুদ্রণালয়ের ব্যবস্থাপক এস এম বিপাশ আনোয়ার বলেন, গত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে প্রকাশনা সংস্থা এখান থেকে কোনো বই ছাপেনি। তবে গত দুই থেকে তিন বছর ধরে বই ছাপা শুরু হয়েছে।
এস এম বিপাশ আনোয়ার প্রথম আলোকে আরও বলেন, প্রেস আধুনিক করা ও এর সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই তার প্রকাশনার চাহিদা পূরণ করতে পারবে, বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থার ইতিহাস বলছে, ১৯২৬ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে মাত্র দুটি বই প্রকাশিত হয়, সবই ইংরেজিতে। প্রথমটি ছিল ১৯২৬ সালে মাইকেল ওয়েস্টের লেখা একটি বই। তবে এরপর দীর্ঘ এক দশক, অর্থাৎ ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোনো বই-ই প্রকাশিত হয়নি। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত মাত্র একটি বই ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। সব মিলিয়ে প্রথম ৩০ বছরে মাত্র তিনটি বই প্রকাশিত হয়, তিনটিই ছিল ইংরেজি ভাষায়।
১৯৫৭ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা বই প্রকাশের মাধ্যমে সংস্থাটি প্রথমবার বাংলায় বই প্রকাশ করে। এই দশকে (১৯৫৬–৬৫) মোট ১০টি বই প্রকাশিত হয়েছিল।
পরবর্তী দশকগুলোতে প্রকাশনার সংখ্যা বাড়লেও ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য বজায় ছিল। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৫টি বইয়ের মধ্যে ৪টিই ছিল ইংরেজি, আর একটি বাংলা বই। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সালে প্রকাশনার সংখ্যা বেড়ে ৩১টি হলেও, সেখানেও ২১টি ইংরেজি বইয়ের বিপরীতে বাংলা বই ছিল ১০টি।
১৯৫৭ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা বই প্রকাশের মাধ্যমে সংস্থাটি প্রথমবার বাংলায় বই প্রকাশ করে। এই দশকে (১৯৫৬–৬৫) মোট ১০টি বই প্রকাশিত হয়েছিল।
সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে—মোট ৪৮টি। এই দশকেও ৩০টি ইংরেজি বইয়ের বিপরীতে ১৮টি বাংলা বই প্রকাশিত হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ২৮টি বইয়ের মধ্যে ১৮টি ইংরেজি ও ১০টি বাংলা বই প্রকাশিত হয়। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশিত ৩১টি বইয়ের মধ্যে ১৬টি ছিল ইংরেজি এবং ১৫টি বাংলা। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৩২টি বইয়ের মধ্যে ১৭টি ইংরেজি এবং ১৫টি বাংলা।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৮৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ১১৮টি ইংরেজি এবং ৭০টি বাংলা।
প্রকাশিত ১৮৮টি বইয়ের সব কপি এখন সংস্থার সংগ্রহে নেই। বিপণন কেন্দ্র জানিয়েছে, অনেক বইয়ের মূল কপিই নেই। তবে ঠিক কতটি বইয়ের মূল কপি নেই, তা নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেনি সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময় নিয়ে খুঁজে জানাতে হবে।
অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, প্রকাশনা সংস্থার বই সংরক্ষণের কোনো বিশেষ পদ্ধতি নেই। টিএসসির নিকটবর্তী ডাকবাংলোর গুদামঘরে বই প্রায় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। প্রকাশিত সব বইয়ের অন্তত পাঁচটি করে কপি সংরক্ষণ করে রাখা দরকার ছিল।
তারিক মনজুর আরও বলেন, এখন মূল কপি খুঁজতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, অন্যান্য লাইব্রেরি, লেখক ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ ছাড়া কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে কি না, তা ঘোষণা দিয়ে খোঁজ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থার এই ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বলেন, ‘প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত পুরোনো সব বই সংগ্রহশালায় রাখার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা।’