
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নারী, সংখ্যালঘু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে এক স্মারকলিপিতে ১০ দফা দাবি জানিয়েছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি।
আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, স্মারকলিপিটি ২১ জানুয়ারি সিইসি বরাবর পাঠানো হয়। ২২ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্মারকলিপিটি গ্রহণ করে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারী, সংখ্যালঘু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কেবল ভোটার হিসেবে দেখা হয়, নাগরিক হিসেবে নয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারী, সংখ্যালঘু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রায়ই সহিংসতার শিকার হয়। তাই নির্বাচনকালে সবার জন্য সমান সুযোগ, ভীতি-সন্ত্রাস-নির্যাতনমুক্ত এবং জেন্ডার সংবেদনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় নারী, সংখ্যালঘু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর স্বার্থান্বেষী মহল সহিংস আচরণ করছে, যা উদ্বেগজনক।
স্মারকলিপিতে ইসির কাছে জানানো ১০ দফা দাবির মধ্যে আছে—দেশের সব প্রান্তের সব নাগরিক যেন নির্বিঘ্নে, স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; নির্বাচন–পূর্ববর্তী, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে নারীসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক নারী-পুরুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীর প্রতি হয়রানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংস আচরণ প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে; নির্বাচনী ব্যয় সংকোচ করে ন্যূনতম নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে এবং এ বিষয়ে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে; স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীসহ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; নারী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী যাতে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেদিকে দৃষ্টি রেখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধাজনক স্থানে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে; জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রনির্বিশেষে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য নিরপেক্ষভাবে সব ধরনের সহায়তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে; জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় সখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল কোটার বিরুদ্ধে। কোটার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারীসমাজ।
ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, আন্দোলন সফলের তিন দিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেগম রোকেয়ার প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়া হয়েছিল। সেখানে কেউ প্রতিবাদ করেনি। এই কোটা আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া নারীবিরোধী যাত্রার প্রভাব আজকের রাজনৈতিক নেতাদের নারীর প্রতি দুঃসাহসে প্রতিফলিত হচ্ছে। নির্বাচনের আগে এটি আরও দৃশ্যমান হবে, তবে জনগণ এর যোগ্য জবাব দেবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি বাংলাদেশের ৭১টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্ল্যাটফর্ম। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষায় কাজ করে আসছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাকের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শাশ্বতী বিপ্লব, একশনএইড বাংলাদেশের উইমেন্স রাইট অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি বিভাগের প্রধান মরিয়ম নেসা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, জাতীয় নারী শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি সাহিদা পারভীন (শিখা), অ্যাসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিজ ইন বাংলাদেশের (এডাব) প্রতিনিধি সমাপিকা হালদারসহ বিভিন্ন নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।