
চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। তবে হঠাৎ করেই সেই সাফল্য বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। চার মাস ধরে দেশের পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি এসে ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশে ঠেকেছে।
চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে ২ হাজার ১১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি আয় হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের ১ হাজার ৯২৬ কোটি ডলারের চেয়ে ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। অর্থবছরের প্রথম চার, পাঁচ ও ছয় মাস শেষে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অবশ্য অর্থবছরের প্রথম দুই মাস শেষে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ।
দীর্ঘদিন ধরেই মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮১ শতাংশের বেশি পোশাক খাত থেকে আসে। মূলত পোশাক রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি না করার কারণেই সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতে ভালো করতে পারছে না বাংলাদেশ। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ১ হাজার ৬৪১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছর একই সময়ে পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৫৭৬ কোটি ডলার। তার মানে এবার পোশাক রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে আলোচ্য সময়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পোশাকের রপ্তানি আয়টি ৫ শতাংশ কম।
রপ্তানি আয়ের এই হালনাগাদ পরিসংখ্যান গতকাল সোমবার প্রকাশ করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। চলতি অর্থবছরের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। গত অর্থবছর আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৪২৫ কোটি ডলার।
গত জানুয়ারি মাসে ৩৩১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। মাসওয়ারি হিসাবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ আয়। গত জানুয়ারিতে ৩১৮ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছিল। সেই হিসাবে এবার জানুয়ারিতে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
পোশাকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আসে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে খাতটি থেকে ৭৪ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে এই আয় ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্যে ৫৬ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া আলোচ্য সময়ে হোম টেক্সটাইলে ৪২ কোটি ডলার, হিমায়িত মাছে ৩২ কোটি ডলার, কৃষিজাত পণ্যে ৩০ কোটি ৮১ লাখ, প্রকৌশল পণ্যে ২৮ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছে।
এ ছাড়া চামড়াবিহীন পাদুকায় ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ডলার, প্লাস্টিক পণ্যে ৭ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, ওষুধে ৫ কোটি ২৬ লাখ ডলার, টেরিটাওয়েলে ২ কোটি ৪৯ লাখ ডলার, আসবাবে ২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার, হস্তশিল্পে ৮০ লাখ ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। এদের মধ্যে চামড়াবিহীন পাদুকায় ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ, প্লাস্টিকে ৪৫ শতাংশ, ওষুধে সাড়ে ৮ শতাংশ, আসবাবে ২৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও হস্তশিল্পে ৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে দেশের অভ্যন্তরের চেয়ে বহির্বিশ্বের কারণই বেশি। বিভিন্ন কারণে মূল আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতি ধীরগতি হয়ে পড়েছে। সে জন্য পণ্য আমদানির চাহিদা কমে গেছে। ফলে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে। আবার চাহিদা কম থাকায় পণ্যের দামও কিছুটা কমে গেছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, চলতি অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, সেটি হিসাবে নিলে বর্তমান পরিস্থিতি দুশ্চিন্তার। এ জন্য নতুন ও উদীয়মান বাজারে পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্য রপ্তানিতে নীতিসহায়তা দেওয়া যেতে পারে। কারণ, এসব বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আছে। যদিও আগের মতো অতটা নেই, তারপরও ভালোই আছে।
সিপিডির এই গবেষক বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই অন্য দেশের তুলনায় ডলারের বিপরীতে টাকা কিছুটা শক্তিশালী। কম শক্তিশালী হলে রপ্তানি বাড়ত। অন্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে ডলার কেনাবেচার ব্যবস্থা করা গেলে পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।