বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ,
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের  চেয়ারম্যান  এম মাসরুর রিয়াজ,

অভিমত

বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরানোই বেশি জরুরি

নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে রেখে। একদিকে শক্তিশালী জনসমর্থন ও সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দায়িত্ব নেওয়া নতুন রাজনৈতিক সরকার, অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে চলমান অর্থনৈতিক সংকট। তাই এটি শুধু নতুন বাজেট বাস্তবায়নের নয়, অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে ফেরানোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সময়।

ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সরকার অর্থনীতির সংকট প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে। এবারের বাজেটে করকাঠামো সহজ করা, করের চাপ কিছুটা কমানো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ কাজে লাগাতে হলে প্রথম অগ্রাধিকার হতে হবে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, বাজারে চাহিদা সংকুচিত হয়েছে এবং ব্যবসার খরচ বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বাড়লেও আমদানি ব্যয়, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বিনিময় হার নিয়ে ঝুঁকি রয়ে গেছে। তাই মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সমন্বয় রাখা জরুরি। বাজেটে নির্ধারিত সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খুব বেশি বাস্তবসম্মত নয়। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে আমদানিও বাড়াতে হবে।

বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি বিনিয়োগ, রপ্তানি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কর্মসংস্থান—দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বড় আকারে না বাড়লেও এসব খাতে গতি ফেরানোই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

শুধু কর কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, জমি, অবকাঠামো, দ্রুত অনুমোদন এবং সহজ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে বাস্তব অর্থে ডি-রেগুলেশন বাস্তবায়ন করাও জরুরি।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যাংক ব্যবস্থা ঠিক করা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৩২ শতাংশ খেলাপি ঋণের সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজির দাম বাড়তে পারে, সে জন্যও প্রস্তুতি প্রয়োজন।

রাজস্ব সংস্কার নতুন করে সাজাতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্য সুবিধা হারানোর আশঙ্কা এবং বৈশ্বিক শুল্ক ও কমপ্লায়েন্সের নতুন বাস্তবতা ইত্যাদি মোকাবিলা বা এগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। পাশাপাশি আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা ও জবাবদিহিভিত্তিক সমন্বিত অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত সদিচ্ছার সঙ্গে কার্যকর বাস্তবায়ন যুক্ত হলে নতুন অর্থবছরটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সংকট থেকে উত্তরণের সূচনা হতে পারে।


এম মাসরুর রিয়াজ, চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ