১৯৯৫-৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে রপ্তানি হয়েছিল ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার পণ্য। কয়েক বছর ধরে মাসে ২০ লাখ টাকার বেশি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে না।

কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যে একদিকে ঘাটতি বাড়ছে, অন্যদিকে আমদানি–রপ্তানির পরিমাণ কমছে। গত ২৭ বছরে মিয়ানমার থেকে ৭ হাজার ৯৬২ কোটি ৫২ লাখ টাকার পণ্য আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকার পণ্য। এতে মোট ঘাটতি হয়েছে ৭ হাজার ৯৬২ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে এই স্থলবন্দরে মিয়ানমার থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার পণ্য, আর বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকার পণ্য। ঘাটতি হয়েছে ২০ কোটি টাকার মতো।
শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা জানান, সীমান্তে চোরাচালান রোধে ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের টেকনাফ ও মিয়ানমারের মংডু শহরকেন্দ্রিক সীমান্ত বাণিজ্য চালু করা হয়েছিল। শুরু থেকে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি চলত। পরে লেনদেনের একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানোর প্রবণতা শুরু হয়। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণে প্রভাব পড়ে। এ পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক বিভাগ এই স্থলবন্দর থেকে ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করেছে।
শুল্ক বিভাগের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে এখন রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কমছে। যেমন গত আগস্ট মাসে মিয়ানমার থেকে ১২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে সেই দেশে হয়েছে মাত্র ২৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকার পণ্য। এতে ঘাটতি হয়েছে ১২২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে সীমান্ত বাণিজ্য চালুর প্রথম মাসে (১৯৯৫-৯৬) সেপ্টেম্বরে ৯ কোটি টাকার পণ্য আমদানির বিপরীতে রপ্তানি হয়েছিল ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার পণ্য। গত কয়েক বছর বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে ২০ লাখ টাকার বেশি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে না।
সীমান্ত বাণিজ্যের আওতায় মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ কাঠ, হিমায়িত মাছ, আদা, পেঁয়াজ, সুপারি, উলের ঝাড়ু, নারকেল, আচার, শুঁটকি, বেত, তেঁতুলের বিচি, ডাল, ছোলা ইত্যাদি আমদানি করে থাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রপ্তানি হচ্ছে আলু, গেঞ্জি, বিস্কুট ও প্লাস্টিক পণ্য।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাংলাদেশের সিমেন্ট, রড, ওষুধ, ঢেউটিনসহ নানা পণ্যের বিশাল বাজারসম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, দেশটির রাজধানী ইয়াঙ্গুন থেকে রাখাইন রাজ্যে পণ্য আনতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয়, তার অর্ধেক হয় টেকনাফ থেকে পণ্য নিতে। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাব রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যে ঘাটতি কমাতে হলে স্থলবন্দরটিকে নৌবন্দরে উন্নীত করতে হবে। সেই সঙ্গে এলসি সুবিধায় পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুযোগ দিতে হবে। এতে হুন্ডি কমবে। তদারকি কার্যক্রমও জোরদার করা দরকার।
সম্প্রতি সরেজমিনে টেকনাফ স্থলবন্দরের জেটিতে গিয়ে আমদানি পণ্যবোঝাই ৩০টি ট্রলার ও জাহাজ দেখা যায়। এর মধ্যে ৪টিতে মাছ; ২১টিতে সেগুন, গর্জন ও চাম্পা কাঠ; ৫টিতে সুপারি, আদা, নারকেল, আচার, শুঁটকি, তেঁতুলের বিচিসহ অন্যান্য পণ্য আনা হয়েছে।
ট্রলার ও কার্গো থেকে পণ্য খালাস করে সরাসরি ট্রাক তোলা হয়। কিন্তু আমদানি পণ্যের আড়ালে চোরাই কিংবা নিষিদ্ধ কোনো পণ্য লুকানো আছে কি না, তা তদারকির কেউ নেই। পণ্য পরীক্ষার স্ক্যানার ও মালামাল খালাসের ক্রেন চোখে পড়েনি।
সেই ২৭ বছর আগে বন্দরের তিন দিকে দেয়াল তুলে দেওয়া হলেও ভেতরে নিরাপত্তার বালাই নেই। পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় শত শত ট্রাক বাইরে সড়কে ফেলে রাখতে হয়। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকের বসার কিংবা বিশ্রামের শেড নেই। সি অ্যান্ড এফ এজেন্টদের কার্যালয়, ব্যাংকের শাখা, ক্যানটিন ও টয়লেট–সুবিধা নেই। গুদামের অভাবে পণ্য খোলামাঠে রাখতে হয়, যা বৃষ্টি হলে ভিজে নষ্ট হওয়ার আশংকা থাকে। কাগজে-কলমে এটি স্থলবন্দর হলেও আমদানি করা পণ্যের বিপরীতে কর আদায় হয় নৌবন্দরের।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নদী খননের নামে মোটা অঙ্কের কর আদায় হলেও গত ২৭ বছরে একবারও খনন করা হয়নি। সরাসরি ট্রলার থেকেই মালামাল ট্রাকে তুলতে হয়। অথচ ওয়্যারহাউস চার্জ আদায় করে কর্তৃপক্ষ। বন্দরের ভেতর থেকে মালামাল চুরি হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ নেই। জেটির সংখ্যাও কম।
কয়েকজন আমদানি-রপ্তানিকারক বলেন, এখন স্থলবন্দরটির নিয়ন্ত্রণ টেকনাফের প্রভাবশালী ও মাফিয়া চক্রের হাতে। যে কারণে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও নোয়াখালীর ব্যবসায়ীরা গুটিয়ে গেছেন।