রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার পরিচালনার মাশুল বা কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ বৃদ্ধির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন
রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার পরিচালনার মাশুল বা কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ বৃদ্ধির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন

কনটেইনার মাশুল হঠাৎ ১০০% বৃদ্ধি, রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা

চট্টগ্রামের কনটেইনার ডিপোগুলোতে আমদানি-রপ্তানি পণ্য ব্যবস্থাপনার বর্ধিত মাশুল আগামী সোমবার থেকে কার্যকর হবে। মাশুল বাড়ানোর এই ঘোষণা দেড় মাস আগে জানিয়েছিল বাংলাদেশ কনটেইনার ডিপো সমিতি বা বিকডা। তবে মাশুল কার্যকরের দুই দিন আগে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন রপ্তানি পণ্য ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবাদ জানান বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএফএফএ) সদস্যরা। তাঁরা বলছেন, অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই কনটেইনার পরিচালন মাশুল ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়বে এবং দেশের সার্বিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রপ্তানিতে খরচ বাড়লে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

বাংলাদেশ কনটেইনার ডিপো সমিতি বা বিকডা গত ১৫ জুলাই এক আদেশে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ধরনের মাশুল বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। ওই আদেশ অনুযায়ী, রপ্তানি পণ্য কনটেইনারে বোঝাই করে ডিপো থেকে বন্দরে নেওয়া পর্যন্ত মাশুল ছিল (৪০ ফুট লম্বা কনটেইনার) ৮ হাজার ২৫০ টাকা। এই মাশুল ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ৪ হাজার ৯৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৩ হাজার ২০০ টাকা করা হচ্ছে। একইভাবে ২০ ফুট লম্বা কনটেইনারের ক্ষেত্রে এই হার ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ হাজার ৯০০ টাকা করা হচ্ছে। আবার ডিপোর ছাউনিতে রপ্তানি পণ্য রাখার ভাড়া ৫৫ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটারের জন্য ৪৫ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০ ফুট লম্বা কনটেইনার রাখার ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করা হয়েছে। এর বাইরে পণ্য বোঝাই ও খালি কনটেইনার ডিপোতে রাখা, হিমায়িত কনটেইনারে বিদ্যুৎ-সংযোগ, খালি কনটেইনার রাখা ও ওঠানো-নামানোর মাশুলও বাড়ানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে রপ্তানি পণ্যের সিংহভাগ ব্যবস্থাপনা করে চট্টগ্রামের ২১টি ডিপো। সারা দেশের কারখানাগুলো থেকে কাভার্ড ভ্যানে রপ্তানি পণ্য প্রথমে ডিপোতে আনা হয়। ডিপোতে কনটেইনার ভরে পরে তা বন্দর দিয়ে রপ্তানি করা হয়। রপ্তানি ছাড়াও আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনারের একাংশ বন্দরের পরিবর্তে ডিপোতে এনে খালাস করা বাধ্যতামূলক। এর বাইরে খালি কনটেইনারও ব্যবস্থাপনা করে ডিপোগুলো। এসব সেবার মাধ্যমে মাশুল আদায় করে তারা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএএফএফএ সদস্য আবরারুল আলম। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কসহ অর্থনীতির সংকটজনক অবস্থায় কনটেইনার ব্যবস্থাপনা খরচ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এ ধরনের পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হবে। ক্রেতারা বিকল্প বাজারে চলে যেতে পারে; এটি রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এই বাড়তি খরচ সামাল দিতে পারবেন না।

এ অবস্থায় কনটেইনার ব্যবস্থাপনা মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা। সংগঠনটির সাধারণ সদস্যরা বলেন, মাশুল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থে এ বিষয়ে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তাঁরা। তাঁরা বলেন, শুল্ক বাড়ানোর পরিবর্তে পরিষেবা উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও ডিপো পরিচালনার দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইসিডিএ) কাছে আরও কিছু দাবি জানিয়েছেন ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ব্যবসায়ীরা। সেগুলো হচ্ছে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, দক্ষ শ্রমিক নিশ্চিত করা ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে খরচ না বাড়িয়ে সেবার মানোন্নয়ন করা। মাশুল না বাড়িয়েই এসব কাজ করা সম্ভব বলে জানান তাঁরা।

আবরারুল আলম বলেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি রপ্তানি খাত। অথচ এই খাতে অতিরিক্ত খরচ চাপিয়ে দিলে রপ্তানি আয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তীব্র হবে ও জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য আনোয়ার হোসেন, আদনান ইকবাল, হাসনাত আবদুল্লাহ, মুনিম মাহফুজ, শামসুল হক প্রমুখ।

ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের প্রতিবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, রপ্তানি ও খালি কনটেইনারের মাশুল প্রদান করেন বিদেশি শিপিং এজেন্টরা। ডিপোগুলো টাকায় মাশুল আদায় করে। বিদেশি শিপিং এজেন্টরা ডলারে হিসাব করেন। টাকার মান কমে যাওয়ায় তাঁদের এখন কার্যত আগের তুলনায় মাশুলের পরিমাণ অর্ধেকে নেমেছে। ফলে টাকায় বাড়লেও ডলারের হিসাবে তা বাড়েনি।