বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎসের একটি প্রবাসী আয় বাড়লেও পণ্য রপ্তানি নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি কমছে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে শীর্ষ পাঁচ খাতের রপ্তানি কমেছে। এতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি কমেছে প্রায় ২ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল রোববার চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের হালনাগাদ রপ্তানি তথ্য প্রকাশ করেছে। গত নভেম্বরের শেষেও সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় ছিল। ডিসেম্বরের শেষে রপ্তানি নেতিবাচক হয়ে গেছে। অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানিতে সাড়ে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
দেশের রপ্তানিকারকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক আরোপের পর বাড়তি ক্রয়াদেশের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি পাওয়া যায়নি। উল্টো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতেও প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রতিবেশী ভারত বিধিনিষেধ আরোপ করায় সে দেশেও রপ্তানি নিম্নমুখী। আবার দেশেও ব্যাংক খাতের কড়াকড়িতে অনেক রপ্তানিকারক সংকটে পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের পাশাপাশি এগুলোর মূল্যবৃদ্ধির কারণেও ব্যবসার খরচ বেড়েছে। সব মিলিয়ে পণ্য রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়ে গেছে বলে দাবি করছেন তাঁরা।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ২ হাজার ৪৫৩ কোটি ডলারের পণ্য। এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৫৩ কোটি ডলার, যা শতাংশের হিসাবে ২ দশমিক ১৯।
— বিশ্বে এখনো পাটপণ্যের যে বাজার আছে, তার খুব অল্পই আমরা নিতে পেরেছি। উল্টো প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ায় আমাদের রপ্তানি কমছে। পাটপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে নীতিসহায়তার পাশাপাশি কাঁচা পাটের বাজারে শৃঙ্খলা আনতে হবে।— তাপস প্রামাণিক, সভাপতি, বিজেএসএ।
এ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানিতে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। তারপর পাঁচ মাস ধরে তা কমেছে। সদ্য বিদায়ী ডিসেম্বরে পণ্য রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। এই মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩৯৭ কোটি ডলারের পণ্য। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ৪৬৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ রপ্তানি খাত হচ্ছে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে মোট রপ্তানিতে এই পাঁচ খাতের হিস্যা ৮৯ শতাংশ। শুধু তৈরি পোশাক খাতের হিস্যাই ৮১ শতাংশ।
তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণেই সামগ্রিক রপ্তানিতে চাপ বেশি পড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ১ হাজার ৯৩৭ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৯৮৯ কোটি ডলারের পণ্য। তার মানে, রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাস তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। গত ডিসেম্বরে রপ্তানি হয়েছে ৩১৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। এই রপ্তানি তার আগের বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ কম। দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য।
তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৫৩ কোটি ডলারের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ কম। গত ডিসেম্বরে ৭ কোটি ডলারের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় সাড়ে ২৭ শতাংশ কম।
— বৈশ্বিক বাজারে ব্যবসা আছে। তবে আমরা ক্রয়াদেশ নিতে পারছি না। কারণ, আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে প্রতিনিয়ত। মূলত গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্নীতির কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমরা বেশি ভুগছি। ভারত–পাকিস্তানের কাছেই আমরা হোম টেক্সটাইলের ক্রয়াদেশ বেশি হারাচ্ছি।—এম শাহাদাত হোসেন, চেয়ারম্যান, বিটিটিএলএমইএ।
তিন খাতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও ডিসেম্বরে পতন
শীর্ষ পাঁচ খাতের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিতে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে তিন খাতের রপ্তানি ডিসেম্বরে কমেছে।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৬১ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। যদিও গত ডিসেম্বরে ৯ কোটি ৭২ লাখ ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ কম।
হোম টেক্সটাইল খাতের রপ্তানি অবশ্য ইতিবাচক ধারায় আছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে এই খাতের ৪২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। যদিও গত ডিসেম্বরে ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি কমেছে। এই মাসে ৭ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল রপ্তানি হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেরিটাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিটিএলএমইএ) চেয়ারম্যান এম শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৈশ্বিক বাজারে ব্যবসা আছে। তবে আমরা ক্রয়াদেশ নিতে পারছি না। কারণ, আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে প্রতিনিয়ত। মূলত গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্নীতির কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমরা বেশি ভুগছি। ভারত–পাকিস্তানের কাছেই আমরা হোম টেক্সটাইলের ক্রয়াদেশ বেশি হারাচ্ছি।’
এদিকে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় থাকলেও প্রবৃদ্ধি খুবই কম। গত ডিসেম্বরে এই খাতের রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে জুলাই-ডিসেম্বরে ৪২ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি মাত্র দশমিক ৩১ শতাংশ।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বে এখনো পাটপণ্যের যে বাজার আছে, তার খুব অল্পই আমরা নিতে পেরেছি। উল্টো প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ায় আমাদের রপ্তানি কমছে। পাটপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে নীতিসহায়তার পাশাপাশি কাঁচা পাটের বাজারে শৃঙ্খলা আনতে হবে।’