বেশ কয়েকটি দেশীয় বড় শিল্পগোষ্ঠী এ খাতে বিনিয়োগ করেছে। বছরে প্রবৃদ্ধি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। বাজারের আকার বেড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা।
দেশে বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানা বৃদ্ধির সঙ্গে দিন দিন বৈদ্যুতিক কেব্ল বা তারের ব্যবহারও বাড়ছে। বিশেষ করে গত দুই দশকে নির্মাণ ও টেলিকমিউনিকেশন খাতে কেবলের ব্যবহার বেড়েছে কয়েক গুণ। চাহিদা বাড়তে থাকায় দেশীয় কোম্পানিগুলো এ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তাতে কমেছে আমদানি। পাশাপাশি এ খাতে কর্মসংস্থানও বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুই দশক আগে কেবলের স্থানীয় বাজার ছিল এক-দুই হাজার কোটি টাকার। বর্তমানে সেই বাজার বড় হয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী এ খাতে বিনিয়োগ করেছে। প্রতিবছর এ খাতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।
অন্যদিকে কেব্ল প্রস্তুতের দিক থেকে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, মোটামুটি সব ধরনের তারই এখন দেশীয় কোম্পানিগুলো তৈরি করছে। তারপরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ তার আমদানি হয়। কেব্ল খাত কম শ্রমঘন একটি শিল্প। তারপরও এই খাতে প্রত্যক্ষভাবে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
উৎপাদনে শতাধিক কোম্পানি
তার বিক্রেতারা জানান, বাজারে বিভিন্ন ধরনের তারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয় বিদ্যুৎ পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত তার। এগুলোকে পাওয়ার কেব্ল বলে। এ ছাড়া রয়েছে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য মাঝারি ও উচ্চ ভোল্টেজের (এলটি/এসটি) কেব্ল; টেলিফোন, ইন্টারনেট ও তথ্য সংযোগের জন্য কমিউনিকেশন কেব্ল; উচ্চগতির ডেটা পরিবহনের জন্য ফাইবার অপটিক কেব্ল। এ ছাড়া কিছু কোম্পানি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমানোর জন্য আগুন–প্রতিরোধী পাওয়ার কেব্ল তৈরি করছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বর্তমানে দেশে কেবলের বাজারে ছোট-বড় শতাধিক কোম্পানি ব্যবসা করছে। এর মধ্যে বিআরবি, বিজলি, বিবিএস, ওয়ালটন, প্যারাডাইস, পলি, পারটেক্স, আরআর, আকিজবশির কেব্লস উল্লেখযোগ্য। দেশে তৈরি তারের ৯০ শতাংশ বাজারই এ কয়েকটি কোম্পানির কাছে। এ ছাড়া কম পরিচিত বা নন-ব্র্যান্ডের আরও অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
দেশে সরকারি তিনটি কেব্ল কোম্পানি রয়েছে। এগুলো হলো বাংলাদেশ কেব্ল শিল্প লিমিটেড (বিসিএসএল), ইস্টার্ন কেব্লস ও গাজী ওয়্যারস। এদের মধ্যে বিসিএসএল টেলিকম কপার কেব্ল, ফাইবার অপটিক কেব্ল, এইচডিপিই সিলিকন কোর ডাক্ট (বিশেষ ধরনের কেব্ল বা তার রাখার পাইপ), বৈদ্যুতিক ও তামার তার তৈরি করে। এ ছাড়া গাজী ওয়্যারস বিভিন্ন তামার তার এবং বাসাবাড়ি ও শিল্প খাতের উপযোগী নিম্ন ভোল্টেজ ও উচ্চ ভোল্টেজের তার তৈরি করে।
বিবিএস কেব্লসের বিক্রয় ও বিপণন পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ কেব্ল খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশ্ব মানের সব ধরনের তারই আমরা তৈরি করছি। ফলে সরকার চাইলে তার আমদানি আরও কমিয়ে আনা যাবে। পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগও তৈরি হবে।’
বাজারে নতুন আকিজবশির গ্রুপ
দেশে তারের বাজারে নতুন যুক্ত হয়েছে আকিজবশির গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আকিজবশির কেব্লস। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি ৩০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে। শুরুতে দেশীয় চাহিদা, শিল্প ও যোগাযোগ খাতে ব্যবহৃত কেব্ল উৎপাদন করবে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী ধাপে উচ্চ বিদ্যুৎ পরিবাহী ক্ষমতার ও বিশেষায়িত কেব্ল উৎপাদন করবে তারা।
কেব্ল উৎপাদন শুরুর জন্য আকিজবশির গ্রুপ গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত এমিনেন্স ইলেকট্রিক ওয়্যার অ্যান্ড কেব্লসের কারখানা অধিগ্রহণ করেছে। কারখানাটি আধুনিকায়ন করে ইতিমধ্যে কেব্ল উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করেছে আকিজবশির কেব্লস। সম্প্রতি এ বাজারজাতকরণের উদ্বোধন করা হয়।
প্রাথমিকভাবে এ কারখানায় বছরে প্রায় ৩০০ টন কপার কেব্ল ও ২০০ টন পিভিসি প্রক্রিয়াজাত করা যাবে। এ কারখানায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫০০ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। চাহিদা বাড়লে আগামী এক বছরে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
আকিজবশির কেব্লসের বিপণন ব্যবস্থাপক এস এম সৈকতুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সব ধরনের তার উৎপাদন করছি। তারের প্রধান উপকরণ হচ্ছে তামা। আমরা যুক্তরাজ্যের লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জ অনুমোদিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বিশ্বমানের তামা সংগ্রহ করছি। এতে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা যায়। এ ছাড়া পিভিসি ও অন্যান্য কাঁচামালও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
নিরাপত্তা প্রধান বিষয়
দেশে অগ্নিকাণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত এক বছরে দেশে ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৬৯টিই ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। আর্থিক মূল্যে বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮০ কোটি টাকার। মূলত নিম্নমানের কিংবা অনুপযোগী তার ব্যবহারের কারণে বেশির বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ড হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য তারা বাসাবাড়ি কিংবা শিল্পকারখানায় ভালো মানের তার ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশের কেব্লশিল্পে সম্ভাবনার পাশাপাশি বেশ কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, কেব্ল উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রধান কাঁচামাল তামা, অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক, ফাইবার প্রভৃতি সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। এসব কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদকদের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। অথচ অনেকে মূলধনি যন্ত্রপাতির আওতায় মাত্র ১ শতাংশ শুল্কে বিদেশ থেকে তার আমদানি করে। এতে প্রতিযোগিতা ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি তারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বলে জানান তাঁরা।
আরএফএল গ্রুপের (বিজলি কেব্ল প্রস্তুতকারক) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল বলেন, দেশীয় কেব্লশিল্পকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহার কমানো জরুরি। বিকল্প হিসেবে সরকার যদি ব্যবহৃত কপার ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির অনুমতি দেয়, তাহলে দেশীয় কোম্পানিগুলো সেগুলো পরিশোধনের মাধ্যমে কাঁচামাল তৈরি করতে পারবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতাও বাড়বে।
আকিজবশির কেব্লসের বিপণন ব্যবস্থাপক এস এম সৈকতুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রাহকেরা তারের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন। আমরা এ জন্য দেশে প্রথমবারের মতো তিন স্তরের ইনসুলেশনযুক্ত কেব্ল বাজারে এনেছি, যা সর্বোচ্চ ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এতে বৈদ্যুতিক আগুনের ঝুঁকি কমবে।’