ভারত ও বাংলাদেশের পতাকা
ভারত ও বাংলাদেশের পতাকা

জুলাই-এপ্রিল ১০ মাস

বিধিনিষেধে ভারতে রপ্তানি কমেছে বাংলাদেশি পণ্যের

এক বছর আগে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে তিন দফায় বিধিনিষেধ দিয়েছে ভারত।

ভারত সরকার এক বছর আগে বাংলাদেশের কিছু পণ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। শুরুতে এর তেমন প্রভাব দেখা না গেলেও পরে এসে দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি কমতে শুরু করে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই–এপ্রিল) ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ কমেছে।

আলোচ্য সময়ে ভারতের বাজারে তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, কাঁচা পাট ও পাটপণ্য, চামড়াবিহীন জুতা এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে। তবে প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি সামান্য বেড়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ভারতে ১৪৬ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ১৫২ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পণ্য। সে হিসাবে রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ।

একাধিক রপ্তানিকারক বলেন, বিধিনিষেধ আরোপের পর ভারতে পণ্য রপ্তানির খরচ বেড়ে গেছে। এতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমেছে এবং রপ্তানিতেও প্রভাব পড়েছে। তাঁদের মতে, বর্তমান সরকার ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিধিনিষেধ শিথিলের উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সুযোগ রয়েছে এবং বিষয়টি খুব জটিল বলে মনে হয় না।
মোস্তফা আবিদ খানসাবেক সদস্য, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন

করোনার পর ২০২১–২২ অর্থবছরে ভারতীয় বাজারে ১৯৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। এরপর টানা দুই বছর রপ্তানি কমে। তবে গত অর্থবছরে ভারত ছিল বাংলাদেশের অষ্টম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। ওই সময়ে দেশটিতে ১৭৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।

গত এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। এরপর বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে তিন দফায় বিধিনিষেধ আরোপ করে ভারত। গত বছরের ১৭ মে ও ২৭ জুন পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, তুলা-সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিক পণ্য ও কাঠের আসবাব রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দেয় ভারত। পরে ১১ আগস্ট আরও কিছু পাটপণ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানির ওপর প্রতিকারমূলক শুল্ক আরোপের বিষয়ে তদন্তও শুরু করে ভারত।

বিধিনিষেধ অনুযায়ী, পাট ও পোশাকপণ্য বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে রপ্তানি করা যাবে না। এসব পণ্য শুধু দেশটির মুম্বাইয়ের নভোসেবা বন্দর দিয়ে রপ্তানি করতে হবে। অন্যদিকে খাদ্যপণ্য ও কোমল পানীয়, কাঠের আসবাব, তুলা-সুতার বর্জ্য এবং প্লাস্টিক পণ্য বুড়িমারী ও বাংলাবান্ধা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত স্থলবন্দরগুলো দিয়ে রপ্তানি করা যাবে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান মনে করেন, ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা মূলত রাজনৈতিক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করার পরই ভারত বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সুযোগ রয়েছে এবং বিষয়টি খুব জটিল বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় তৈরি পোশাক। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৫০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের ৫৬ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের বাজার অনেক বড়। এটি হাতছাড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বিধিনিষেধ শিথিল করতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, এরপর ভারত বিধিনিষেধ আরোপ করে। তবে বর্তমানে সমুদ্রপথে ভারতীয় সুতা আসছে।

ভারতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি পণ্য কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এ খাতের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১৮ কোটি ৮ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৬৬ শতাংশ কম।

একই সময় তৃতীয় বৃহৎ রপ্তানি পণ্য কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১১ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ শতাংশ কম। আগের বছরের একই সময়ে এ রপ্তানি হয়েছিল ১৫ কোটি ডলারের পণ্য।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক বলেন, পাটপণ্যের অন্যতম বড় বাজার ভারত। এই বাজারকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ভারতের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত সরকারের।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভারত বৈশ্বিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দেশটির মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা চলছে। ফলে ভবিষ্যতে ভারতের বাণিজ্য আরও বাড়বে এবং সেখানে বাংলাদেশের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ থাকবে। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতিতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বিশেষ উদ্যোগ দরকার। প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হলে দ্রুত সমাধান আসতে পারে।