দেশের প্লাস্টিক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। কিন্তু ওই অঞ্চলে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে কাঁচামালের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। কাঁচামালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় মজুত কমছে। এ অবস্থায় অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাচ্ছে। আবার কেউ কেউ পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান সংকটের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে প্যাকেজিংনির্ভর খাদ্য, ওষুধ ও পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মূলত প্লাস্টিক পণ্য তৈরি হয় পেট্রোকেমিক্যাল থেকে। আর পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদিত হয় ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল থেকে, যা আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধ শুরুর আগে অপরিশোধিত তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ৭২ মার্কিন ডলার। অয়েল প্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল ১০২ ডলার।
এই খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাস্টিক পণ্যের প্রতি টন কাঁচামালের দাম ছিল ৯০০ থেকে ৯৫০ মার্কিন ডলার, যা এখন দেড় হাজার ডলারের কাছাকাছি। এ ছাড়া কাঁচামাল জাহাজীকরণের ব্যয় বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধ থাকায় কাঁচামালের সরবরাহও কমে গেছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরএফএল মাসে প্রায় ১০ হাজার টন কাঁচামাল ব্যবহার করে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০ ধরনের কাঁচামাল দিয়ে ৫ হাজারের বেশি পণ্য তৈরি করে। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাঁচামাল আসে চীন থেকে।
আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আর এন পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুদ্ধের ফলে প্লাস্টিকের কাঁচামালের দাম ৪০-৫০ শতাংশ বেড়েছে। আমরাও পণ্যের দাম ১০-১৫ শতাংশ বাড়িয়েছি। ভোগ্যপণ্য থেকে পোশাক—প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। ফলে সব উপখাতেই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে পণ্যের দাম আরও ১৫-২০ শতাংশ বাড়তে পারে।’
* কাঁচামালের চাপ সামলাতে কারখানাগুলো উৎপাদন কমিয়েছে, কেউ কেউ অবশ্য পণ্যের দাম বাড়িয়েছে।* খাদ্য, ওষুধ, পোশাক ও ভোগ্যপণ্যের প্যাকেজিং খাতে বেশি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা।* দেশে প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের আকার ৫০ হাজার কোটি টাকার।
প্লাস্টিকের তৈরি আসবাব, খেলনা ও বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে আকিজ প্লাস্টিকস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি মাসে প্রায় তিন হাজার টন পলিপ্রোপাইলিন (পিপি) কাঁচামাল আমদানি করে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
আকিজ প্লাস্টিকসের পরিচালন প্রধান মিনহাজ বিন মিজান বলেন, একদিকে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে দেশে জ্বালানির অভাবে পণ্য সরবরাহ কমে গেছে। তাই কারখানার উৎপাদনও ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে। যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন আরও কমাতে হবে।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্লাস্টিকের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার। এই খাতে ছোট-বড় প্রায় ৬ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ প্লাস্টিক শিল্প খাতে কাজ করছেন। প্লাস্টিক শিল্পের সঙ্গে দেশের আরও ৩০ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাসরি জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফার্মাসিউটিক্যালস, পোশাক ও ভোগ্যপণ্য খাত।
জানতে চাইলে বিপিজিএমইএর সভাপতি শামীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্লাস্টিক প্যাকেজিং ছাড়া অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে সরবরাহ করা যায় না। দেশে বছরে প্লাস্টিক কাঁচামালের চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টনই আমদানি করা হয়। ফলে আমদানি কমে গেলে অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।’
কারখানা অচলাবস্থায় চলে যাবে
এসিআইয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসিআই প্রিমিয়াফ্লেক্স লিমিটেড প্রতি মাসে প্রায় দুই হাজার টন প্লাস্টিক কাঁচামাল ব্যবহার করে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের কাঁচামালের ৯০ শতাংশ আমদানি করে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ কাঁচামাল আসে দুবাই ও ভারত থেকে। বাকি কাঁচামাল আসে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ২০ শতাংশ বেশি দামে কাঁচামাল আমদানি করছে।
এসিআই প্রিমিয়াফ্লেক্সের নির্বাহী পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, কাঁচামাল সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে বহু কারখানা অচলাবস্থায় চলে যাবে। ফ্লেক্সো প্যাকেজিংয়ের (অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ওপর রঙিন নকশার প্যাকেট) প্রায় সব কাঁচামালই পেট্রোলিয়ামনির্ভর রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয়। তাই ফ্লেক্সো প্যাকেজিংয়ের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সব প্যাকেটজাত পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী মাসগুলোতে কাঁচামালের দাম আরও ১০-১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য প্লাস্টিকের বোতল ও প্যাকেজিং তৈরি করে লুনা পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ। সব মিলিয়ে মাসে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০০ টন কাঁচামাল প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। বাকি কাঁচামাল আসে ভারত, চীন, তাইওয়ান ও থাইল্যান্ড থেকে।
লুনা পলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ এস এম কামাল উদ্দিন বলেন, এই খাতে কাঁচামাল আমদানিতে ৩২ শতাংশ কর দিতে হয়। এ খাতে ব্যাংকের সহায়তাও কম। এর সঙ্গে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্লাস্টিক শিল্প খাত গভীর সংকটে পড়ে যাবে। যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ভারতও কাঁচামাল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। কয়েক দিন আগে তা চালু হলেও কাঁচামালের টনপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৮০০ ডলার।