
প্রতিবারই নির্বাচনের সময় মোটরসাইকেলের ব্যবসা জমজমাট থাকে। বিক্রি বাড়ে মোটরসাইকেলের। কিন্তু এবারের নির্বাচন মৌসুমে মোটরসাইকেল ব্যবসার আগের সেই জমজমাট ভাব নেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মাঠপর্যায়ে প্রার্থীদের প্রচারণায় মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়ে। এমন ধারণা থেকে প্রস্তুতি নেন বিক্রেতা ও প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে প্রত্যাশা থাকলেও মোটরসাইকেলের বাজারে মোটরসাইকেল বিক্রি বাড়ার প্রতিফলন দেখা যায়নি। নতুনের পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুর, বংশাল, আবদুল্লাহপুরসহ বিভিন্ন এলাকার পুরোনো মোটরসাইকেলের বাজারে আশানুরূপ বিক্রি বাড়েনি।
তবে সব মোটরসাইকেল নির্বাচন উপলক্ষে বিক্রি হয়েছে কিংবা প্রচার–প্রচারণায় ব্যবহার হয়, তা নয়। তবে নির্বাচনের সময় মোটরসাইকেলের ব্যবহার হয়। অনেকে নতুন মোটরসাইকেল কেনেন।
২০১৮ সালের নির্বাচন হয় ৩০ ডিসেম্বরে। দেশের বিভিন্ন মোটরসাইকেল বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ৩৮ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল। তারপরে অক্টোবর মাসে বিক্রি হয়েছিল ৩৭ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল। নির্বাচনের মাস ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার মোটরসাইকেল। তবে নির্বাচনের পর জানুয়ারি মাসে মোটরসাইকেল বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৩৭৭টি।
এসব প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল ২৮ হাজারের বেশি। ডিসেম্বর মাসে কমে হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল। আর নির্বাচনের মাসে সেই বিক্রি বেড়ে হয়েছিল ২৮ হাজার ৪৮০টি। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে মোটরসাইকেল বিক্রির সংখ্যা কমে হয়েছে ২৬ হাজার ৭০৯টি।
তবে এবার আগামী বৃহস্পতিবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তেমন বিক্রি বাড়েনি মোটরসাইকেলের। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় ৩৭ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল। এরপর সে বছরের ডিসেম্বর মাসে বিক্রি হয় সাড়ে ৩৫ হাজার মোটরসাইকেল। আর সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে দেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বিক্রি হয় ৩৩ হাজার ৪০৯টি।
এ বিষয়ে সুজুকি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান মোটর বাইকসের নির্বাহী পরিচালক কাজী আশিক উর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একসময় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে বিক্রি ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ত। তবে গত দুই নির্বাচনে বিক্রি খুব একটা বাড়তে দেখা যায়নি। এবারও মোটরসাইকেল বিক্রি বৃদ্ধি নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি ছিল। তবে মোটরসাইকেল বিক্রি তেমন বাড়েনি।’
দেশে মোটরসাইকেল বাজারজাতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, আগে দেশে নির্বাচনে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক নেতা–কর্মীরা মোটরসাইকেলে করে প্রচারণা করতেন। এ ছাড়া ২০০৮ সালের নির্বাচনসহ ২০১৪ সালেও নির্বাচনের সময়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিক্রি বেড়েছে। শেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে মোটরসাইকেল বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিভিন্ন নেতারা বড় সংখ্যার মোটরসাইকেল ক্রয়াদেশ দিয়েছিলেন।
তাঁরা আরও জানান, সময়ের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার ধরন বদলেছে। আগের মতো মাঠপর্যায়ের চেয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর প্রচার বৃদ্ধি পাওয়ায় সরাসরি যানবাহননির্ভর প্রচারণা কমেছে। সেই সঙ্গে দেশে সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ ও ভোক্তাদের ব্যয়সংকোচনের প্রভাবও মোটরসাইকেল বিক্রি কমার পেছনে বড় কারণ।
হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেডের কোম্পানি সচিব ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) বিজয় কুমার মণ্ডল বলেন, এবার নির্বাচনকেন্দ্রিক মোটরসাইকেল বিক্রি তেমন বাড়েনি। তবে গত বছর থেকে সার্বিক মোটরসাইকেল বিক্রি বেড়েছে। তাই চলতি বছরে মোটরসাইকেল বিক্রি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
হোন্ডা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হোন্ডা লিমিটেডের (বিএইচএল) প্রধান বিপণন কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের কারণে মোটরসাইকেল বিক্রিতে খুব একটা প্রভাব পড়েনি। বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সাধারণত ভোক্তারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হন। এবারও তা–ই হয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে প্রত্যাশা থাকলেও রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় পুরোনো মোটরসাইকেলের বিক্রি তেমন বাড়েনি। মিরপুর, বংশাল, আবদুল্লাহপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিক্রি আগের তুলনায় কমই রয়েছে। যদিও এসব দোকানে মডেলভেদে পুরোনো মোটরসাইকেল নতুন মোটরসাইকেলের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম দামে পাওয়া যায়।
রাজধানীর আবদুল্লাহপুর এলাকার পুরোনো মোটরসাইকেল বিক্রির প্রতিষ্ঠান মেসার্স রোমান মোটরসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ রুবেল বলেন, সরকার পতনের আগে মাসে ৭০টির বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হতো। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১৫ থেকে ২০টিতে। ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় বিক্রি ভালো থাকলেও এবারের নির্বাচনের আগে প্রত্যাশিত চাহিদা তৈরি হয়নি। বরং বিক্রি কমেছে।
একই চিত্র নরসিংদীর পলাশ উপজেলার পুরোনো মোটরসাইকেল বিক্রির দোকান ভূঁইয়া মোটরসেও। নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দিয়ে ১০০টির বেশি মোটরসাইকেল বিক্রির একটি ভিডিও প্রকাশ করা হলেও বাস্তবে তার প্রভাব খুব একটা পড়েনি। দোকানটির বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ সোহান মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমানে সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি মোটরসাইকেল বিক্রি হচ্ছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক যে বাড়তি বিক্রি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।