বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড) আয়োজিত ‘তৈরি পোশাকশিল্পে এলডিসি–পরবর্তী প্রভাব’ নিয়ে আয়োজিত পরামর্শ সভায় উপস্থিত অতিথিরা। আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড) আয়োজিত ‘তৈরি পোশাকশিল্পে এলডিসি–পরবর্তী প্রভাব’ নিয়ে আয়োজিত পরামর্শ সভায় উপস্থিত অতিথিরা। আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে

গবেষণার তথ্য

যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইইউতে ১০% বেশি দাম পান রপ্তানিকারকেরা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা ইউরোপীয় বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি দাম পান, যার প্রধান কারণ দুই বাজারে শুল্ককাঠামোর পার্থক্য ও অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা। তবে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ হলে বাংলাদেশ ইইউতে এই সুবিধা হারাতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সুরক্ষাব্যবস্থার কারণে ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পোশাক রপ্তানিতে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঝুঁকিও রয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় গবেষণাটির তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে ইইউর সঙ্গে সুবিধাজনক বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করা এবং নতুন সম্ভাবনাময় বাজারে অনুকূল বাণিজ্য সুবিধা অর্জনের জন্য আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাবির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক তৈয়েবুর রহমান এবং অর্থ ও বাণিজ্যবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আকতার।

র‌্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাবির উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক আবু ইউসুফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো বদরুন্নেসা আহমেদ, বাংলাদেশ রিজিওনাল কানেক্টিভিটি প্রকল্পের (বিআরসিপি) বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মো. মুনির চৌধুরী, বিশ্বব্যাংকের বাণিজ্য নীতি ও বাণিজ্য সহজীকরণ উপদেষ্টা হাফিজুর রহমান এবং র‌্যাপিডের গবেষণা পরিচালক ও ঢাবির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. দীন ইসলাম।

অনুষ্ঠানে ‘এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রমাণ: অগ্রাধিকারমূলক ও অগ্রাধিকারবিহীন বাজারে রপ্তানি মূল্য নির্ধারণ’ শীর্ষক এ গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন র‌্যাপিডের উপপরিচালক ও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের প্রভাষক জিল্লুর রহমান। তিনি জানান, শুল্ক বিভাগ থেকে ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ পোশাক কারখানা উভয় বাজারে পণ্য রপ্তানি করে।

জিল্লুর রহমান জানান, প্রধান পোশাক পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে গড়ে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপে বেশি দাম পাওয়া যায়। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় জার্মানিতে (ইইউ) টি–শার্ট রপ্তানিতে ২০–২৭ শতাংশ এবং ট্রাউজার রপ্তানিতে ৯–১৫ শতাংশ বেশি দাম পাওয়া যায়। শীর্ষ ১০টি পোশাক পণ্য বিবেচনা করলে রপ্তানিকারকেরা ইউরোপীয় বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেশি দাম পান।

দুই বাজারেই চাপ রয়েছে

অনুষ্ঠানে জিল্লুর রহমান জানান, ভিন্ন বাণিজ্য ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হলেও বাংলাদেশ উভয় বাজারেই (যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ) রপ্তানি বৃদ্ধি করতে পেরেছে। বিশেষ করে অগ্রাধিকারমূলক শুল্কসুবিধা থাকায় ইইউতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রয়েছে উচ্চ শুল্ক। সেখানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই শুল্কের কিছুটা বহন করেন রপ্তানিকারকেরা।

গবেষণায় উঠে এসেছে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ক্রেতাদের কাছ থেকে তুলনায় ৩০–৩৫ শতাংশ বেশি দাম আদায় করতে পারে। আবার যারা বেশি সংখ্যক দেশে রপ্তানি করে, তারা ইউরোপে ১–৩ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৪–৫ শতাংশ বেশি দাম পায়। শুধু একধরনের পণ্য রপ্তানি করলে ১০–১৩ শতাংশ কম দাম পাওয়া যায়।

রপ্তানিনির্ভর বিনিয়োগ প্রয়োজন

অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান বলেন, ‘গত ৫০ বছরে আমরা বিকল্প বাজার বা পণ্যের প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারিনি। কিন্তু আমাদের এখন রপ্তানিনির্ভর বিনিয়োগ প্রয়োজন। প্রস্তুতি ছাড়া এলডিসি উত্তরণ হলে এবং অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা না থাকলে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো দুই জায়গাতেই বড় আঘাত আসবে।’

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার বলেন, ‘আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা সব কটি ডিম এক ঝুড়িতে রেখেছি। পণ্য ও বাজারে যথাযথ বৈচিত্র্য তৈরি হয়নি। ফলে যখনই যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, তা আমাদের জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসে।’

বিশ্বব্যাংকের বাণিজ্য নীতি ও বাণিজ্য সহজীকরণ উপদেষ্টা হাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে লো-কস্ট বা লো-প্রাইস ব্র্যান্ড থেকে হাই-প্রাইস ব্র্যান্ডে স্থানান্তর হতে হবে। এতে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগীসক্ষম থাকবে।

বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো বদরুন্নেসা আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বৈচিত্র্যময়, তাই কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি। কিন্তু ইইউর পণ্যের দাম ও বৈচিত্র্য কম হওয়ায় প্রতিযোগিতার চাপ বেশি।