
এশিয়াজুড়ে নির্মাণ খাতের অগ্রগতি বৈশ্বিক অবকাঠামোর চেহারা বদলে দিচ্ছে। চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে এ অঞ্চল এখন বৈশ্বিক রেডিমিক্স কংক্রিট বাজারের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশও এ আঞ্চলিক অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাতে-কলমে আর শ্রমনির্ভর সাইট-মিক্সিং পদ্ধতির পরিবর্তে উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর ও শিল্পায়িত কংক্রিট ব্যবস্থায় রূপান্তর এখন আর শুধু বিকল্প নয়; বরং দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার জন্য একটি প্রয়োজনীয়তা।
বাংলাদেশে রেডিমিক্স কংক্রিটের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও এর অগ্রগতি হয়েছে বেশ দ্রুত। ১৯৯৩ সালে দেশে এ প্রযুক্তির সূচনা হলেও ১৯৯৮ সাল থেকে এটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক গতি পেতে শুরু করে। বিশেষত ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো দ্রুত সম্প্রসারণশীল নগরকেন্দ্রগুলোয়।
একসময় যা ছিল একটি সীমিত পরিসরের সমাধান, তা আজ একটি বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান সারা দেশে ১০০টির বেশি রেডিমিক্স কংক্রিট প্ল্যান্ট পরিচালনা করছে।
খাতটি প্রতিযোগিতামূলক। শাহ্ সিমেন্ট রেডিমিক্স কংক্রিট, ক্রাউন, বসুন্ধরা রেডিমিক্স কংক্রিট, এনডিই রেডিমিক্স কংক্রিটসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রকৌশলের কঠোর চাহিদা পূরণ ও বাজার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে শাহ্ সিমেন্ট রেডিমিক্স কংক্রিট সর্বোচ্চ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে এককভাবে এ খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে প্রচলিত নির্মাণ সাইট মানেই ছিল পরিবেশগত দূষণের একটি পরিচিত চিত্র। খোলা সিমেন্টের ব্যাগ, উন্মুক্ত অ্যাগ্রিগেটের স্তূপ এবং সাইটে মিক্সারের অবিরাম শব্দ ছিল নগর উন্নয়নের সাধারণ দৃশ্য। তবে এ প্রচলিত পদ্ধতির মূল্যও ছিল অনেক বেশি।
উপকরণের উল্লেখযোগ্য অপচয়, শব্দদূষণ এবং বাতাসে সূক্ষ্ম ধুলিকণার ছড়িয়ে পড়া—শাহ্ সিমেন্ট রেডিমিক্স কংক্রিট এ চিত্রে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। জনবহুল সড়ক ও নির্মাণস্থল থেকে উৎপাদন সরিয়ে নিয়ন্ত্রিত ও কম্পিউটারাইজড সুবিধায় নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচ্ছন্ন নির্মাণ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে।
এ প্রক্রিয়ায় অনুমাননির্ভরতা দূর হয়। যেহেতু মিক্সিং একটি আবদ্ধ পরিবেশে সম্পন্ন হয়, তাই আশপাশের মানুষের জন্য যে ধুলাবালু ও শব্দদূষণ তৈরি হয়, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ট্রানজিট মিক্সার যখন সাইটে পৌঁছায়, তখন কংক্রিট ঢালাইয়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকে। এটি নির্মাণকে করে আরও পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর।
টেকসই নির্মাণকাজ শুরুই হয় কাঁচামালের দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে। প্রচলিত সাইট-মিক্সড কংক্রিটে প্রায়ই অতিরিক্ত অর্ডার বা ভুল মিক্সিং অনুপাতের কারণে অতিরিক্ত উপকরণ তৈরি হয়, যা পুনর্ব্যবহার করা যায় না এবং তা শেষ পর্যন্ত পরিবেশগত বর্জ্যে পরিণত হয়।
শাহ্ সিমেন্ট রেডিমিক্স কংক্রিট ‘জিরো ওয়েস্ট’ উৎপাদন মডেলের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করেছে। প্রকৌশলীরা নির্দিষ্ট ঢালাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক পরিমাণ ও গ্রেড নির্ধারণ করতে সাইটে প্রি-ভিজিট অ্যাসেসমেন্ট পরিচালনা করেন।
শাহ্ সিমেন্ট রেডিমিক্স কংক্রিট থাইল্যান্ডের বৃহত্তম রেডিমিক্স কংক্রিট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সিয়াম সিটি গ্রুপের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে স্ট্যান্ডার্ডাইজড মিক্স ডিজাইন তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিটি ব্যাচ নির্ভুল অনুপাতে প্রস্তুত ও সমভাবে মিশ্রিত হয়। প্রতিটি ডেলিভারিতে নিশ্চিত করে ধারাবাহিক মান, উন্নত শক্তি ও নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্স।
শাহ্ সিমেন্ট রেডিমিক্স নিজস্ব ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েট) কর্তৃক স্বাধীন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতি ঘনমিটার কংক্রিটে ধারাবাহিক গুণগত মান, উচ্চতর শক্তি এবং অতুলনীয় নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে।
২৫০টির বেশি ট্রানজিট মিক্সার এবং ৫০টি পাম্পের বিশাল বহর নিঃসন্দেহে একটি বড় শিল্প সক্ষমতার পরিচয়। তবে শাহ্ সিমেন্ট রেডিমিক্স কংক্রিট তাদের লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করে।
ঢাকার মতো শহরে, যেখানে যানজট একটি ছোট দূরত্বকেও দীর্ঘ যাত্রায় পরিণত করতে পারে, সেখানে পরিবহন সময় টেকসই করার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শাহ্ সিমেন্ট একটি ভৌগোলিক সমাধান গ্রহণ করেছে।
রাজধানী ও এর আশপাশে ১২টি কৌশলগত এলাকায় ১৪টি প্ল্যান্ট পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এমন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যা নির্মাণস্থলের কাছাকাছি থাকার জন্য পরিকল্পিত। মূল কৌশল হলো—নির্মাণ সাইটের যতটা সম্ভব কাছাকাছি থাকা। পাশাপাশি কম ডেলিভারি দূরত্ব, মানে কম জ্বালানি ব্যবহার।
রেডিমিক্স কংক্রিটের পথে এ রূপান্তর দেশের নির্মাণশিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে। বাংলাদেশ যখন বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিচ্ছে, সেই সময় রেডিমিক্স কংক্রিট শুধু একটি লজিস্টিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও।
কৌশলগত বিস্তৃতি: রাজধানী ও আশপাশে ১২টি লোকেশনে ১৪টি প্ল্যান্ট পরিচালনা করছে।
উন্নত বহর: ২৫০টির বেশি জিপিএস-সক্ষম ট্রানজিট মিক্সার রয়েছে।
জিরো ওয়েস্ট প্রযুক্তি: সিয়াম সিটি গ্রুপের প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় কম্পিউটারাইজড ব্যাচিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
যাচাইকৃত মান: প্রতিটি ব্যাচ নিজস্ব ল্যাবরেটরি এবং বুয়েটের মাধ্যমে পরীক্ষিত।
গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অবদান: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কংক্রিট সরবরাহ করেছে।