যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি

যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধার পাল্লা আরও ভারী

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কমানোর লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে সই হওয়া বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করার পর চুক্তিটি নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছে।

দুই দেশের বাণিজ্য তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পাল্টা শুল্কচুক্তিতে সুবিধার ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্লা ভারী। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিতে হবে। তার বিপরীতে বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে পাল্টা শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু যে পাল্টা শুল্ককে কেন্দ্র করে এই সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটিই এখন দেশটির আদালতের রায়ে বাতিল। তাতে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের সুবিধা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়বে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের ২০২৫ সালের আমদানি–রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড়ের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ২ হাজার ১৬টি পণ্য গত বছর বাংলাদেশ আমদানি করেছে। এসব পণ্যের মোট আমদানিমূল্য ছিল প্রায় ৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। চুক্তি কার্যকর হলে ধাপে ধাপে এসব পণ্যের শুল্ক কমানো বা বাতিল করা হলে তাতে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় কমতে পারে প্রায় ৪১৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি পণ্যে যেসব সুবিধার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবচিত্র খুবই সীমিত। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে যে সুবিধার কথা বলেছে, গত বছর সেই তালিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৪টি পণ্য। এসব পণ্যের মোট রপ্তানিমূল্য ছিল প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলারের। বাংলাদেশ যদি এসব পণ্যে পাল্টা শুল্কসুবিধা পেত, তাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে রাজস্ব ছাড় দিতে হতো প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার বা প্রায় দেড় কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে গেছে। তাই নতুন করে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে চুক্তি বহাল থাকলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সুবিধা আরও কমে যাবে। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নেমে আসবে প্রায় ১ লাখ ডলার বা ১ কোটি ২৩ লাখ টাকায়।

এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, তৈরি পোশাক ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বড় রপ্তানি পণ্যের একটি ‘হ্যাট অ্যান্ড আদার হ্যাটগিয়ার’ শ্রেণির পণ্য। গত বছর শ্রেণির পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি ডলারের। বাণিজ্যচুক্তি অনুযায়ী, এই একটি পণ্যে শুল্কসুবিধা মিললে ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যের সম্মিলিত সুবিধার তুলনায় প্রায় ৩৭০ গুণ বেশি লাভবান হতে পারত বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই পাল্টা শুল্ক আদালতে অবৈধ ঘোষণা হয়েছে। ফলে চুক্তির তাৎপর্য অনেকটাই কমে গেছে।
মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

তাই সব মিলিয়ে যে চিত্র দাঁড়াচ্ছে তা হচ্ছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যেসব পণ্যে সুবিধা পাওয়ার কথা, সেগুলোর রপ্তানি খুবই সীমিত। ফলে চুক্তি কার্যকর হলে বাণিজ্য ভারসাম্যে সুবিধার পাল্লা তুলনামূলকভাবে আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর গত ১০ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের সদ্য সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছিলেন, দুটি বড় অর্জন হয়েছে। পাল্টা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক শূন্য হবে। তবে পাল্টা শুল্ক বাতিলের পর সেই দুই সুবিধাই কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ কী

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) ওয়েবসাইটে শনিবার পর্যন্ত আটটি ‘রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ চুক্তির দলিল প্রকাশ করা হয়েছে। এই আট দেশের একটি বাংলাদেশ।

এই অবস্থায় চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিটি হয়তো বাতিল হয়ে যাবে। বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। ২৪ ফেব্রুয়ারির পর বোঝা যাবে, কী হতে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই পাল্টা শুল্ক আদালতে অবৈধ ঘোষণা হয়েছে। ফলে চুক্তির তাৎপর্য অনেকটাই কমে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে দেশভিত্তিক বা পণ্যভিত্তিক অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে পারে, যা বাংলাদেশকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।