ইরান যেভাবে টিকে আছে
ইরান যেভাবে টিকে আছে

অর্থনৈতিকভাবে ক্ষয়ে গেছে ইরান, তার জেরেই এই বিক্ষোভ

ইরান বলতেই একধরনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রসঙ্গ মাথায় আসে। দেশটির বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের এন্তার অভিযোগ—সে দেশে মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়। দেশটির ওপর নানা ধরনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও আছে। তারপরও দেশটি টিকে আছে।

নিষেধাজ্ঞার মুখে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নজর দিয়েছে ইরান। তার ঝলক গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক দিনের যুদ্ধে দেখাও গেছে। কিন্তু দেশটি ভেতর থেকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষয়ে গেছে। দেশটিতে চলমান আন্দোলন তার জেরেই।

বাস্তবতা হলো, ভয়াবহ মূল্যস্ফীতিতে ইরান জেরবার। মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে ইরান এখন ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেখা যাক, বিপ্লবের আগে-পরে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল। আজকের এ অবস্থায় তারা কীভাবে উপনীত হলো।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের অর্থনীতি ছিল দ্রুত সম্প্রসারণশীল। এখনকার মতো তখনো দেশটি ছিল তেলনির্ভর। ১৯৬০–৭০-এর দশকে শাহের শাসনামলে তেল বিক্রির অর্থে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগরায়ণ হয়েছে। ওই সময় ইরানের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বিস্তৃত হয় শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তখন ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আধুনিক অর্থনীতি হয়ে ওঠে।

তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত যা হয়, ইরানেও তা–ই হয়েছে। সেটা হলো, এই প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছায়নি। গ্রাম-শহরের বৈষম্য, তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুঁজির উত্থান ও সামাজিক অসন্তোষ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক অগ্রগতির আড়ালে গভীর সংকট তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে শেষমেশ রাজনৈতিক বিস্ফোরণের পথ প্রশস্ত হয়।

বিপ্লবের আগে প্রবৃদ্ধি

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, ১৯৬১ সালে ইরানের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৭৫ সালে সংকোচন ছাড়া এই ১৪ বছরে দেশটির গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। ১৯৭৬ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি হয় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

বিপ্লবের বছর ১৯৭৯ সালে দেশটির জিডিপি সংকোচন হয় ১২ শতাংশ। ১৯৮০ সালে সংকোচন হয় ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৯৮১ সালেও সংকোচন হয় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর ১৯৮২ সালে একধাপে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর ইরান ১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে দুই অঙ্কের ঘরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। কিন্তু এরপর ইরানের প্রবৃদ্ধি আর কখনো দুই অঙ্কের ঘরে যায়নি। ২০১০ সালের পর বেশ কয়েক বছর দেশটির অর্থনৈতিক সংকোচন হয়েছে।

বিশ্ববাজারে ইরানি রিয়ালের ব্যাপক দরপতনে দেশটির অর্থনীতি ভয়াবহ চাপে পড়েছে

অর্থনীতির কাঠামো

ইরানের অর্থনীতি মূলত মিশ্র ও হাইড্রোকার্বননির্ভর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ তেল ও গ্যাস মজুত এই দেশে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক সংকট ও ২০২৫ সালের ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতি চাপের মুখে আছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (তেলসহ) জিডিপি শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে যা ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

দেশটির জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ৫০ শতাংশের বেশি। চীনে ছাড় দিয়ে রপ্তানি করলেও তেল থেকে বার্ষিক আয় প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। রিয়ালের রেকর্ড দরপতন হয়। বেকারত্বের হার ৯-১০ শতাংশের মধ্যে। ফলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে।

সেই সঙ্গে ইরানের অর্থনীতির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ বিপ্লবী বাহিনী আইআরজিসির হাতে। ভর্তুকিজনিত ঘাটতি ও সীমিত বৈচিত্র্যের কারণে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে, যদিও তেলবহির্ভূত খাতে কিছুটা সহনশীলতা দেখা যাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, ইরানের অর্থনীতি এখন একধরনের ধৈর্যের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাপের মুখে এটি বাঁকতে পারে, কিন্তু ভেঙে পড়ে না। ইরানের অর্থনীতি সম্পর্কে একবাক্যে এ কথাই বলা যায়। দেশটির প্রবৃদ্ধির হার কমছেই। মানুষের জীবনমানের স্থায়ী উন্নতি হয়নি। মুদ্রা দুর্বল—বিনিয়োগ কমে গেছে।

এই সংকট যে আকাশ থেকে ভেঙে পড়েছে, বিষয়টি মোটেও তা নয়। বরং গত কয়েক দশকে নেওয়া বিভিন্ন কাঠামোগত সিদ্ধান্তের সঞ্চিত ফল।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরানের আজকের স্থবিরতার মূল কারণ কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং পারমাণবিক সংকট শুরুর আগেই তার সূত্রপাত। ১৯৭৯ সালের পর ইরানের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো যেভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে, এই সংকটের গোড়া সেখানেই। ইরানের অর্থনৈতিক সংস্কার কখনোই শেষ হয়নি।

মুদ্রার ভয়াবহ দরপতন

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ৭০ ইরানি রিয়াল পাওয়া যেত। ২০২৬ সালের শুরুতে তা বেড়ে ১৪ লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ চার দশকে ইরানের মুদ্রা মূল্য হারিয়েছে কার্যত প্রায় ২০ হাজার গুণ।

এই পতনের জন্য সাধারণত নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে দায়ী করা হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল রাখা–সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের ওপর আবারও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। পরমাণু অস্ত্রের বিস্তাররোধী চুক্তির আওতায় ইরানের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা সীমিত করা।

পুনর্বহাল হওয়া জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে প্রচলিত অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি–সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ, নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও ইরানের ওপর একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। পাশাপাশি মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহের অভিযোগেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে ইরান।

তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রকল্প ‘ইরান ওপেন ডেটা’র তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানি করতে গিয়ে ইরানের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২০ শতাংশ। চীন ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে চালান বাড়লেও এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।

তেল বিক্রি করে পোষাচ্ছে না

তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রকল্প ‘ইরান ওপেন ডেটা’র তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানি করতে গিয়ে ইরানের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২০ শতাংশ। চীন ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে চালান বাড়লেও এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।

নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যয়বহুল ও পরোক্ষ পথে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় ইরানের আয়ের ঘাটতি এখনো কাটেনি।

বাস্তবতা হলো, ক্রেতা টানতে অনেক সময় ইরানকে কম দামে তেল ছাড়তে হয়। এরপর মধ্যস্থতাকারী ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেই তেল সরবরাহ করা হয়। তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিটে’ করে তেল পরিবহন করা হয়। শুধু তা–ই নয়, নিষেধাজ্ঞার চোখ এড়াতে খোলা সমুদ্রে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর কিংবা অফশোরে তেল মজুত করা হয়। এসব কারণে বাড়তি খরচ পড়ে। ফলে লাভের গুড় শেষমেশ পিঁপড়ায় খায়।

ইরান ওপেন ডেটার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ইরান তেল রপ্তানি থেকে আয় করেছে প্রায় ২৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু প্রচলিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে হিসাব করলে এই আয় ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারত। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা এড়াতে গিয়ে ইরানকে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় দিতে হয়েছে। কথা হচ্ছে, এই ক্ষতি তারা কীভাবে পুষিয়ে নেবে।

পারস্য উপসাগরের উত্তরে ইরানের একটি তেল ও গ্যাসক্ষেত্র

বিশ্বব্যাংকের মতে, তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ও দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান কার্যত হারানো সময়ের খপ্পরে পড়েছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটির মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) গড়ে প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হারে কমেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে প্রায় এক কোটি ইরানি দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী ইরানিদের হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

শুধু দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়েনি; দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা অনেক ইরানির জীবন অনিশ্চয়তার কবলে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৪০ শতাংশ ইরানি দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। অর্থাৎ নিকট ভবিষ্যতে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের বেশি মানুষের দরিদ্র হয়ে পড়ার শঙ্কা আছে। ২০১১ সালের তুলনায় এই ঝুঁকি ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে।

সমান্তরাল অর্থনীতির উত্থান

ইরানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার বড় কারণ ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীর অর্থনৈতিক তৎপরতা। ১৯৯০-এর দশকে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের সময় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে তাদের প্রধান প্রকৌশল শাখা খাতাম আল-আনবিয়া বড় বড় সরকারি প্রকল্পের ঠিকা পেতে শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে তেল ও গ্যাস, অবকাঠামো, পরিবহন, বন্দর, টেলিযোগাযোগ, খনি, লজিস্টিকসসহ নানা খাতে তাদের কার্যক্রমের বিস্তার ঘটে। সংক্ষেপে বললে, সবচেয়ে লাভজনক ও নিশ্চিত আয়ের উৎসগুলোর ওপর তাদের আধিপত্য তৈরি হয়।

এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতিও হয়েছে। দেখা গেছে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই ও সীমিত পরিসরের বেসামরিক তদারকির মধ্যে তাদের এসব কাজ দেওয়া হয়েছে। ফলে গড়ে উঠেছে দ্বিমুখী অর্থনীতি—একদিকে নিয়ন্ত্রিত বেসামরিক খাত, অন্যদিকে সামরিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সমান্তরাল ব্যবস্থা।

ইরানি কর্মকর্তারা আবার এ নিয়ে গর্বও করেন। প্রায়ই তাঁরা বলেন, নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ইরান একধরনের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তুলেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রচারিত এই নীতিমালা ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘সাধারণ নীতি’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।

বাস্তবে হয়েছে কী, এই স্লোগান রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ও নিরাপত্তাবাহিনী-প্রভাবিত অর্থনীতিকে রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে। কার্যত সম্পদ ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং বেসরকারি খাত কোণঠাসা হয়েছে।

পরিহাসের বিষয় হলো, পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে উল্টো সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে, যদিও তা দুর্বল হওয়ার কথা ছিল।

এর মধ্যে ইরানে কর্মরত বিদেশি কোম্পানিগুলো ইরান ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খেয়েছে। কিন্তু আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য বিদেশি মুদ্রার প্রাপ্যতা জরুরি, সেই বিদেশি মুদ্রা পেতে তাদের সমস্যা হয়নি। সেই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যপথ এবং নিরাপত্তা সুরক্ষার সুবিধা তো তারা পেয়েছেই।

অন্যদিকে ইরানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রক্ষার দায়িত্বে থাকা গার্ডিয়ান কাউন্সিলের কল্যাণেও সামরিক গোষ্ঠী ও তাদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়েছে। বিপ্লবী গার্ডের সুবিধা নিশ্চিত করতেই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারি দপ্তর বা সরকারেও তাদের পছন্দের মানুষেরা স্থান পেয়েছে—এই দুই পথেই তারা প্রভাব বিস্তার করেছে।

ইরানের মুদ্রার ভয়াবহ দরপতন হয়েছে

স্থির হার বনাম বাস্তব হার

এ ব্যবস্থায় মুদ্রার অস্থিরতা আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি কাঠামোগত হয়ে উঠেছে। ডলার বা আমদানি লাইসেন্স পাওয়ার বিষয়টি বাজারের চেয়ে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ওপর বেশি নির্ভর করে। এতে রিয়ালের ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর সরকার প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানির জন্য ডলারের মান নির্ধারণ করে ৪২ হাজার রিয়াল। ভর্তুকি দিয়ে এই হার নির্ধারণ করা হয়। ডলারের মজুত কমতে থাকায় পরবর্তী বছরগুলোতে ধাপে ধাপে এই হারে লেনদেনের সুযোগ সীমিত করা হয়।

২০২২ সালে সেই নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হলেও দ্রুতই আরেকটি ভর্তুকিযুক্ত হার চালু করা হয়—ডলারপ্রতি ২ লাখ ৮৫ হাজার রিয়াল। অথচ বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪ সালে বাজারে সমান্তরাল হারে ডলারের দাম ছিল প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৬ লাখ ৩০ হাজার রিয়াল। এই ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে ডলার বাজার পণ্য না হয়ে সরকারের বণ্টনযোগ্য বিশেষাধিকারে পরিণত হয়।

বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, ইরান প্রায়ই বাজেট–ঘাটতি মেটাতে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ করে। স্থায়ী মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর পদক্ষেপ।

ফলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সঞ্চয় ডলার বা পণ্যে রূপান্তর করে। এতে রিয়ালের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ক্রমবর্ধনশীল চক্রে পরিণত হয়।

তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে যেসব স্লোগান শোনা যায়, তাতেই বোঝা যায়, ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতা কতটা। অন্তত ১৬ শতক থেকে এই বাজার শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি ব্যবসায়ী ও সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রাণকেন্দ্র। সেই সঙ্গে সামাজিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

ধীরে ধীরে গ্র্যান্ড বাজার জন–অসন্তোষের শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা সেখানে প্রতিবাদকারীদের জমায়েতের অর্থই হলো, ইরানের এই বাণিজ্যিক হৃৎপিণ্ড ঠিকমতো সারা দেহে (দেশে) ঠিকঠাক রক্ত সঞ্চালন করতে পারছে না।

‘ব্যবসায়ীরা মরতে পারে, কিন্তু অপমান সহ্য করে না’—এ ধরনের স্লোগান যখন এই ঐতিহাসিক গলিপথে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন তা শুধু প্রতিবাদ নয়, গভীর অর্থনৈতিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে। মনে রাখা দরকার, ইরানের ব্যবসায়ীরা কখনো সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি; বরং তাঁরা ছিল বিপ্লবের কট্টর সমর্থক। কিন্তু এবার নিজেদের প্রিয় রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে।

সূত্র: ইউরো নিউজ, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান