
বিশ্বের সব বাজারে বিনিয়োগের ঝুঁকি এক নয়। কোথাও স্থিতিশীলতা বেশি, কোথাও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করে, যুদ্ধের ডামাডোল বা উত্তেজনাও আছে, আবার নিষেধাজ্ঞা বা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও রয়েছে। এসব কারণে কোনো কোনো দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেশি, কোথাও কোথাও কম।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে ইকুইটি রিস্ক বা বিনিয়োগের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেছেন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অশ্বথ দামোদারান। কোনো দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে গেলে বিনিয়োগকারীরা অতিরিক্ত কত মুনাফা আশা করেন, সেটি পর্যালোচনা করে তিনি ঝুঁকির মোট ১৭৭টি দেশকে নিয়ে একটি বৈশ্বিক তালিকা তৈরি করেছেন। তালিকাটি প্রকাশ করেছে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট ডট কম।
অধ্যাপক অশ্বথ দামোদারান জানান, বিশ্বের কিছু স্থিতিশীল অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। তবে যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক ধসের কারণে অনেক দেশে এই ঝুঁকির হার ৩০ শতাংশের বেশি।
অধ্যাপক অশ্বথ দামোদারানের তৈরি করা বিশ্ব ঝুঁকি সূচকে সর্বোচ্চ ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ ঝুঁকি রয়েছে চারটি দেশে। দেশগুলো হচ্ছে বেলারুশ, লেবানন, সুদান ও ভেনেজুয়েলা। এগুলোর পেছনেই রয়েছে ৮টি দেশ, যাদের প্রতিটিতেই ঝুঁকির মাত্রা ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ। বলিভিয়া, কিউবা, মিয়ানমার, উত্তর কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিরিয়া, ইউক্রেন ও ইয়েমেন।
—১৭৭টি দেশ নিয়ে তৈরি করা হয় এই তালিকা। —অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেন না। তাঁরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সংস্কার এবং বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য এসব বিষয় বিবেচনা করেই বিনিয়োগ করেন।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে রয়েছে কানাডা, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, নেদারল্যান্ডসসহ ১২টি দেশ। এসব দেশের প্রতিটিতে ঝুঁকির মাত্রা ৪ দশমিক ২ শতাংশ। বিনিয়োগকারীরা সম্ভবত এসব দেশকে প্রায় একই ধরনের নিরাপদ বাজার হিসেবে বিবেচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ঝুঁকির মাত্রা ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। সারা বিশ্বে মাত্র ১৯টি দেশের ঝুঁকির মাত্রা ৫ শতাংশের কম। যদিও সব বাজারে ঝুঁকি ও মুনাফার সমীকরণ এক নয়।
এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫৮তম। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকির মাত্রা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে চারটি দেশ। এর মধ্যে মিয়ানমার সপ্তম ও শ্রীলঙ্কা নবম। উভয় দেশেই ঝুঁকির মাত্রা ১৯ দশমিক ৮। মালদ্বীপ ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ নিয়ে ২৪তম ও পাকিস্তান ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ নিয়ে ৩৯তম অবস্থানে রয়েছে। নেপাল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে ৮২তম ও ভারত ৭ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ে ১০৫তম হয়েছে।
অশ্বথ দামোদারান এই ঝুঁকির হিসাব করতে প্রতিটি দেশের ক্রেডিট রেটিং বা ঋণমান এবং দেশটিকে ঋণ দিতে গেলে বিনিয়োগকারীরা কত বাড়তি সুদ চান, তা বিবেচনায় করেছেন। এর সঙ্গে বাজার কতটা পরিণত, সেটিও বিবেচনায় নিয়েছেন। তাঁর মতে, ঝুঁকির পেছনে রয়েছে দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট।
২০২০ সালের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর বেলারুশে বিরোধী মত দমনে কঠোরতা বেড়েছে। লেবাননে শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। সেখানে রাস্তায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। সে জন্য দেশটিকে অনেকেই কার্যত ব্যর্থ রাষ্ট্র মনে করেন।
আফ্রিকার সুদানে ২০২৩ সাল থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে, যা ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে। আর ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতার মধ্যে আছে। তেলশিল্প ও অর্থনীতির দুর্ব্যবস্থাপনা একসময়কার সমৃদ্ধ এই দেশটিকে বড় সংকটে ফেলেছে।
ঝুঁকির বিচারে গোটা ইউরোপকে একরকম দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ঋণসংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে রয়েছে স্পেন ও পর্তুগাল। উভয় দেশেরই ঝুঁকির মাত্রা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এই হার ইতালিতে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ও গ্রিসে ৭ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ, উন্নত অর্থনীতির ভেতরেও অতীতের আর্থিক ধাক্কা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় এখনো প্রভাব ফেলছে।
সব ধরনের বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেন না। তবে উদীয়মান বাজারগুলোতে মুনাফার সম্ভাবনা যত বড়ই হোক, বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন দেশগুলোকেই অগ্রাধিকার দেন, যেখানে স্থিতিশীলতার লক্ষণ, অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য দেখা যায়।