৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল গত ২৭ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। মাত্র ৯৮ দিনের মধ্যে ২১ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর খাতা মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রকাশ করা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) জন্য নিঃসন্দেহে একটি দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য। তবে এই দ্রুততার আড়ালে যে বাস্তবতা চাপা পড়ে যাচ্ছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
এই বিসিএসে ৩ হাজার ১৪০টি পদের বিপরীতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ৪ হাজার ৪২ জন প্রার্থী। আপাতদৃষ্টিতে সংখ্যাটি স্বাভাবিক মনে হলেও ক্যাডারভিত্তিক বিশ্লেষণে এক গুরুতর বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে সাধারণ ক্যাডারের জন্য ২ হাজার ৩৩৬ জন, কারিগরি বা পেশাগত ক্যাডারের জন্য ৭৩৮ জন এবং উভয় ক্যাডারের জন্য ৯৬৮ জন নির্বাচিত হয়েছেন। এখান থেকেই ক্যাডারভিত্তিক নিয়োগ কাঠামোর অন্তর্নিহিত অসামঞ্জস্য পরিষ্কার হয়ে যায়।
সবচেয়ে প্রকট সংকট তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য ক্যাডারে। ৪৬তম বিসিএসে সহকারী সার্জন পদে ১ হাজার ৬৮২ জন এবং সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে ১৬ জনসহ মোট প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন চিকিৎসক নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে ছিল আরও ৪৯টি পদ। অথচ বাস্তবতা হলো স্বাস্থ্য ক্যাডারে উত্তীর্ণ করানো হয়েছে মাত্র দুই শতাধিক প্রার্থীকে। অর্থাৎ সব প্রার্থী ভাইভায় উত্তীর্ণ হলেও প্রায় দেড় হাজার পদ শূন্য থেকে যাবে। একটি উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে প্রান্তিক মানুষ ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত, সেখানে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এত বিশালসংখ্যক পদ শূন্য থাকা রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য সরাসরি হুমকি।
অন্যান্য ক্যাডার থেকে স্বাস্থ্য ক্যাডারের মৌলিক পার্থক্য হলো একজন চিকিৎসককে এমবিবিএস ডিগ্রির পর বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য দীর্ঘ ও কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করা হয়। অথচ বাংলাদেশে আজও একজন চিকিৎসককে বিসিএস পাসের জন্য ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করতে হয় বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য কিংবা গণিতের সূত্র মুখস্থ করার প্রতিযোগিতায়। পেশাগত দক্ষতার চেয়ে সাধারণ বিষয়ের ওপর এই অতি নির্ভরশীলতা অনেক যোগ্য প্রার্থীকে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে দিচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বিদ্যমান অসংগতি সংস্কারের প্রশ্নে অগ্রগতি এখনো অস্পষ্ট। এটি কেবল ব্যক্তিগত হতাশা নয়, বরং একটি গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। একদিকে রাষ্ট্রের জরুরি সেবা খাত শূন্য পদ নিয়ে ধুঁকছে, অন্যদিকে যোগ্য প্রার্থীরা একটি সেকেলে মূল্যায়ন পদ্ধতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে চাকরি না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। এই বৈপরীত্য কোনোভাবেই কাম্য নয়।
৪৬তম বিসিএস আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সমস্যা মেধার নয়, সমস্যা পরিকল্পনার। পিএসসি যেন কেবল ‘পরীক্ষা গ্রহণকারী’ প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থেকে শূন্য পদের বাস্তবতা অনুযায়ী দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারণী অংশীদার হিসেবে সমাধান খোঁজে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটবে, নাকি প্রতিবছর একই শূন্য পদ আর একই হতাশার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে?
* লেখক: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চাকরিপ্রার্থী