বাংলাদেশে নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বেড়েছে, এ কথা সত্য। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা এখন নানা সংকটে চাপে পড়েছে। কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা শুধু শারীরিক আঘাতে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্যে রয়েছে মৌখিক অপমান, মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বেতনবৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং অভিযোগ করেও প্রতিকার না পাওয়ার অভিজ্ঞতা। এসব কারণে অনেক নারী চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন, অনেকে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারছেন না, আবার কেউ কেউ শুরুতেই নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
পরিসংখ্যানও এ উদ্বেগকে স্পষ্ট করে। এক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০১০ সালের ৩৬ শতাংশ থেকে ২০১৩ সালে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। আবার ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে নারীর অংশগ্রহণের হার ৪০ দশমিক ৮৯ শতাংশ দেখা গেলেও ২০২৩ সালের ২ দশমিক ৫৩ কোটি নারী শ্রমশক্তি ২০২৪ সালে কমে ২ দশমিক ৩৭ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ অংশগ্রহণের হার ও মোট সংখ্যার মধ্যে এই পার্থক্যই দেখায়, বাস্তবে কর্মে যুক্ত নারীদের অবস্থান এখনো ভঙ্গুর এবং অনিশ্চিত।
কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার সবচেয়ে প্রচলিত রূপ হলো মৌখিক ও মানসিক নির্যাতন। অনেক নারীকে প্রতিনিয়ত শুনতে হয়, মেয়েরা চাপের কাজ সামলাতে পারে না, বিয়ে হলে তো চাকরি ছাড়বেই, কিংবা এই পদে নারী মানায় না। এসব মন্তব্য শুধু অপমানজনকই নয়, নারীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয় এবং কর্মপরিবেশকে বৈরী করে তোলে। এর সঙ্গে যখন যুক্ত হয় অসম বেতন, পদোন্নতিতে বৈষম্য, মাতৃত্বকালীন সুবিধার ঘাটতি, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, তখন কর্মক্ষেত্র আরও অনিরাপদ হয়ে ওঠে।
যৌন হয়রানি এই সংকটকে আরও তীব্র করে। অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য, অশোভন অঙ্গভঙ্গি, ব্যক্তিগত বার্তা, অনভিপ্রেত স্পর্শ, এমনকি চাকরি বা মূল্যায়নের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চাপের মতো বিষয় অনেক নারীকে নীরবে সহ্য করতে হয়। অভিযোগ করলে চাকরি হারানোর ভয়, বদলি হওয়ার আশঙ্কা, কিংবা উল্টো অপমানিত হওয়ার সংস্কৃতি এখনো বড় বাধা হয়ে আছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৩৯ জন সাংবাদিকের মধ্যে ১৫ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। নারী সাংবাদিকেরা পুরুষদের তুলনায় বেশি মৌখিক, অনলাইন ও শারীরিক হয়রানির মুখে পড়েছেন এবং বহু ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ উদাহরণ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সাংবাদিকতা তুলনামূলক দৃশ্যমান ও সংগঠিত পেশা। সেখানে যদি এমন চিত্র দেখা যায়, তবে অনানুষ্ঠানিক খাত, নিম্নআয়ের কাজ, কারখানা বা সেবা খাতে পরিস্থিতি যে আরও কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাংলাদেশের হাইকোর্ট ২০০৯ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেখানে বলা হয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ তদন্ত ও প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৯০-ও কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি বন্ধে একটি শক্তিশালী কাঠামো দিয়েছে। কিন্তু আইন ও নীতিমালা থাকলেই যথেষ্ট নয়; জরুরি হলো তার কার্যকর বাস্তবায়ন। সচেতনতার অভাব, দুর্বল অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে এখনো বহু নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে কর্মক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার নীতি, কার্যকর অভিযোগ কমিটি, সমান মজুরি, নিরাপদ যাতায়াত, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে মানিয়ে নিতে হবে এই মানসিকতা বদলানো ছাড়া নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আর সেটিই নারীর টেকসই অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রধান শর্ত।
লেখক: একটি জাপানি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত