
১ হাজার ১২২টি পদের বিপরীতে ৭ লাখ প্রার্থীর আবেদন দেশের শিক্ষিত বেকার সমস্যার ভয়াবহতাকেই স্পষ্ট করেছে। এই হিসাবে প্রতিটি পদের জন্য লড়বেন গড়ে ৬২৪ জন প্রার্থী।
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ও মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬৫ হাজার ৪৫৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৩৪ হাজার ১৫৯টি প্রধান শিক্ষকের পদই শূন্য। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়ে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। বিশাল এই শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ হাজার ১২২টি পদের। শূন্য পদের তুলনায় এই বিজ্ঞপ্তি অত্যন্ত অপ্রতুল। বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদন করেছেন প্রায় ৭ লাখ চাকরিপ্রার্থী। তবে আবেদনের প্রক্রিয়া গত বছরের অক্টোবরে শেষ হলেও এখন পর্যন্ত পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত হয়নি।
তীব্র প্রতিযোগিতা ও শিক্ষক–সংকট
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষক–সংকটের কারণে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৫ হাজার ৪৫৭টি। বিশাল এই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রধান শিক্ষকের সংকট কাটানোর লক্ষ্যে গত বছরের ৩১ আগস্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ১ হাজার ১২২টি পদের বিপরীতে ৭ লাখ প্রার্থীর আবেদন দেশের শিক্ষিত বেকার সমস্যার ভয়াবহতাকেই স্পষ্ট করেছে। এই হিসাবে প্রতিটি পদের জন্য লড়বেন গড়ে ৬২৪ জন প্রার্থী।
পিএসসির প্রস্তুতি ও সতর্কতা
বিশাল এই নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে গত ৯ জানুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ‘ডিজিটাল নকল’ ও ‘কেন্দ্র কন্ট্র্যাক্টের’ অভিযোগ ওঠায় এবার বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে কমিশন।
এ প্রসঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত বিশাল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ। পরীক্ষাটি শুধু ঢাকা কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য আমরা সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করছি। যেহেতু নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তাই এই বড় আয়োজনে সরকারের বিশেষ সহযোগিতা ও আর্থিক বরাদ্দের প্রয়োজন হবে।’ তিনি জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে পরীক্ষাটি নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
আবেদনের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এক পদের বিপরীতে ৬২৪ জন প্রার্থীর লড়াই, তাই প্রস্তুতিটাও অনেক কঠিন। কিন্তু পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা না হওয়ায় পড়ার ছন্দ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
বিধিমালা ও পদসংখ্যা হ্রাস
শুরুতে পিএসসির বিজ্ঞপ্তিতে ২ হাজার ১৬৯টি শূন্য পদের কথা বলা হলেও নিয়োগ বিধিমালা সংশোধিত হওয়ায় সরাসরি নিয়োগের পদের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২২টি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। পদসংখ্যা প্রায় অর্ধেক হয়ে যাওয়ায় ও বেতন গ্রেড উন্নীত হওয়ায় প্রতিযোগিতার মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
পরীক্ষাপদ্ধতি
পিএসসি জানিয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষা হবে মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে। এর মধ্যে ৯০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে যেখানে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞান থেকে প্রশ্ন থাকবে। লিখিত পরীক্ষায় পাসের জন্য ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা পরবর্তী ধাপে ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে দ্রুত এই নিয়োগ সম্পন্ন করা জরুরি। ৭ লাখ প্রার্থীর এই তীব্র প্রতিযোগিতার ভিড়ে শেষ পর্যন্ত কারা যোগ্য শিক্ষক হিসেবে উত্তীর্ণ হবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।