এআই বনাম মানুষ: ২০২৬ সালে চাকরির বাজারে টিকে থাকার লড়াই

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমাদের চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি কাজকে করে তুলবে অনেক সহজ? এই বিতর্ক এখন তুঙ্গে। কর্মক্ষেত্র বিশেষজ্ঞ ও লেখক ড. ট্রেসি ব্রাউয়ারের মতে, এআইকে অস্বীকার করা মানে কয়েক দশক আগে ইন্টারনেটকে অস্বীকার করার মতোই বোকামি। তবে যন্ত্র যখন মানুষের মতো ভাবতে শুরু করে, তখন মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি আর সৃজনশীলতা কতটুকু টিকে থাকবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এআই আমাদের কাজের ধরন ও মানুষের অভিজ্ঞতায় বড় পরিবর্তন আনবে। আমাদের উচিত সাবধানতার সঙ্গে এই পরিবর্তনের পূর্বাভাস বোঝা এবং এআইকে ব্যবহার করে নিজেদের মানবিক গুণাবলিকে আরও উন্নত করা।

সম্প্রতি এসএইচআরএম ও এমআইটিসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় এআইয়ের প্রভাব নিয়ে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য উঠে এসেছে।

কাজের গতি বাড়ছে, কিন্তু দক্ষতা কি কমছে

রবার্ট হাফ ও এসএইচআরএমের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭৭ শতাংশ কর্মী মনে করেন এআই ব্যবহারের ফলে তাঁরা কম সময়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারছেন। প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের (পিঅ্যান্ডজি) ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহার করে একজন একাই পুরো একটি দলের সমান কাজ করতে সক্ষম।

তবে এখানে একটি বড় ঝুঁকি আছে, যাকে বিশেষজ্ঞেরা বলছেন ‘সুপারভিশন প্যারাডক্স’। অ্যানথ্রোপিকের তথ্যমতে, ৫৯ শতাংশ ইঞ্জিনিয়ার এআই ব্যবহার করে ৫০ শতাংশ বেশি কাজ করলেও তাঁরা মাত্র ২০ শতাংশ কাজ এআইকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারেন। কারণ, এআইয়ের ভুল ধরতে আপনার গভীর জ্ঞান প্রয়োজন। কিন্তু সব কাজে এআইয়ের ওপর নির্ভর করলে ধীরে ধীরে আপনার সেই মৌলিক জ্ঞানই হারিয়ে যেতে পারে।

মস্তিষ্ক কি অলস হয়ে যাচ্ছে

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এআই আমাদের বিচারবুদ্ধি বা ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’–এর ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। এমআইটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কেবল এআই ব্যবহার করে কাজ করেন, অন্যদের তুলনায় তাঁদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা এবং সংযোগ প্রায় ৫৫ শতাংশ কমে যায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এআই দিয়ে কাজ করালে মানুষ সেই কাজের ওপর আর ‘মালিকানা বোধ’ অনুভব করে না। এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা লেখায় কাঠামো সুন্দর হলেও তাতে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বা মৌলিক চিন্তার অভাব থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানুষের স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

এআই যুগে চাকরি হারানোর শঙ্কা

চাকরি হারানোর আতঙ্ক এআইয়ের যুগের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। জরিপে দেখা যাচ্ছে ৮৬ শতাংশ নির্বাহী কর্মকর্তা এআই ব্যবহার করে এন্ট্রি-লেভেল বা শুরুর দিকের চাকরিগুলো কমানোর পরিকল্পনা করছেন। এসএইচআরএম-গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ শতাংশ চাকরি উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। ম্যাককিনসি বলছে, বর্তমানে ৬০ শতাংশ পেশার অর্ধেক কাজই স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব। তবে আশার কথা শুনিয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। তাদের মতে, এআই ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি প্রতিস্থাপন করলেও বিশ্বজুড়ে ১৭ কোটি নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করবে।

মানবিক সংযোগের অভাব

এআইয়ের সাহায্য নেওয়া অনেক সময় কাজের একঘেয়েমি দূর করলেও, এটি মানুষকে ক্রমশ একা করে দিচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করে এআই মানুষের মধ্যে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। যারা সারা দিন এআইয়ের সঙ্গে সময় কাটান, তাঁদের মধ্যে একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার হার বেশি দেখা গেছে। এআইয়ের সঙ্গে এই ‘সিনথেটিক’ সম্পর্ক মানুষের সহানুভূতি এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে।

টিকে থাকার উপায়

এআইয়ের যুগে (ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড) টিকে থাকতে হলে শুধু কারিগরি দক্ষতা থাকলেই চলবে না। আমাদের জোর দিতে হবে সেই সব জায়গায় যেখানে যন্ত্র এখনো হার মানে। মানুষের সুকুমারবৃত্তি—যেমন সহানুভূতি (এমপ্যাথি), দলগত কাজ এবং সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধিকে আরও শাণিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত কর্মীদের এআই ব্যবহারের সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তাঁরা যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে যন্ত্রকে কাজে লাগাতে পারেন। দিন শেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, এআই একটি সহায়ক সরঞ্জাম মাত্র। আমরা কীভাবে এটি ব্যবহার করব এবং এর মাঝেও নিজেদের মানবিকতা কতটা টিকিয়ে রাখব, তার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। ফোর্বস অবলম্বনে