
দীর্ঘদিন পর ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচিত হওয়ায় দেশের তরুণসমাজের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে লাখ লাখ শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থী এখন তাকিয়ে আছেন নবনির্বাচিত সরকারের দিকে। তাঁদের প্রত্যাশা, বিগত বছরগুলোর স্থবিরতা কাটিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় গতি ফিরবে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। বিশেষ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিন্ডিকেট ভাঙা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটানো এবং সরকারি-বেসরকারি চাকরির বৈষম্য দূর করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার প্রত্যাশা করছেন, নতুন সরকার তাদের ঘোষিত ইশতেহার অনুযায়ী রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও মেধাভিত্তিক একটি স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
সরকারি ও বেসরকারি চাকরির মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করাকে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন চাকরিপ্রার্থীরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ফারজানা ইয়াসমিন মনে করেন, দুই খাতের ভারসাম্য রক্ষায় ন্যায্য মজুরিকাঠামো ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি নীতিমালা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বেসরকারি চাকরিতে নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করতে পারলে সরকারি চাকরির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান নিয়োগপ্রক্রিয়ার কারিগরি ত্রুটিগুলো সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একই দিনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া একটি বড় অনিয়ম। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকলে এই স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করা সম্ভব।
চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের জায়গা হলো প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগে আর্থিক লেনদেন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিকা সরকার আক্ষেপ করে বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রমের পর পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর পেলে সব আশা হতাশায় পরিণত হয়।’ তিনি সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ডিজিটাল নকল আর কেন্দ্র কন্টাকেরউদাহরণ টেনে এই সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি জানান।
প্রায় একই কথা ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী শফিউল আমিনের। তাঁর মতে, ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়া এ দেশে অনেকটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পরিশ্রমী প্রার্থীদের বঞ্চিত করছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তরুণদের মতে, দুর্নীতির দায়ে কেউ ধরা পড়লে তাকে স্থায়ীভাবে সব পরীক্ষা থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত।
সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগে ‘পুলিশ ভ্যারিফিকেশন’ নিয়ে অনেক সময় হয়রানির অভিযোগ ওঠে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইইউবিএটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোহসীন মোস্তফা আরাফাত মনে করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ যেন চাকরি থেকে বঞ্চিত না হয়। ফৌজদারি অপরাধ না থাকলে ভ্যারিফিকেশনের নামে কারও নিয়োগ আটকে রাখা বা আর্থিক অনিয়ম বন্ধে একটি একক নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। তিনি আরও মনে করেন, সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে বিনিয়োগ বাড়বে, যার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল রাষ্ট্রে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা নতুন সরকারের জন্য অন্যতম প্রধান কাজ। নবনির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বে থাকা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও চাকরি খাতের সংস্কার ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার রয়েছে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার অর্পা বলেন, অনেক সেক্টরে পদ শূন্য থাকলেও নিয়োগপ্রক্রিয়া ঝুলে আছে। এই স্থবিরতা কাটিয়ে দ্রুত ফলাফল প্রকাশ ও নিয়মিত নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। গণতন্ত্রের নবযাত্রায় তরুণেরা আশা করছেন, নতুন সরকার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং মেধার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করবে।