একসময় গল্প বলা মানেই ছিল আগুন জ্বালিয়ে বসে উপকথা শোনা বা শোনানো। কিন্তু সেই গল্প বলাই এখন ঢুকে পড়েছে করপোরেট দুনিয়ায়—একেবারে চাকরির পদবি হয়ে। বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা ও কমপ্লায়েন্স প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন লোক খুঁজছে, যাঁদের কাজ হবে ‘করপোরেট ন্যারেটিভের মালিকানা নেওয়া’।
গুগল, মাইক্রোসফট, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার (এমঅ্যান্ডএস) ও নোশন—এমন বহু বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান স্টোরিটেলার, কাস্টমার স্টোরিটেলিং ম্যানেজার কিংবা হেড অব স্টোরিটেলিং নামে নতুন নতুন পদ তৈরি করছে। এসব চাকরির কাজ রূপকথা লেখা নয়; বরং জটিল প্রযুক্তি, পণ্য ও করপোরেট দর্শনকে সহজ ও বিশ্বাসযোগ্য গল্পে রূপ দেওয়া।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুগল ক্লাউড ইতিমধ্যে একটি আলাদা স্টোরিটেলিং টিম গড়ে তুলেছে। এই টিমের কাজ হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা, সাইবার নিরাপত্তা ও ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রাহকের সফলতার গল্প তুলে ধরা। একইভাবে মাইক্রোসফটের নিরাপত্তা বিভাগ ‘ন্যারেটিভ ও স্টোরিটেলিং’ দেখভালের জন্য একজন জ্যেষ্ঠ পরিচালক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে।
এই প্রবণতা শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। কমপ্লায়েন্স প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ভান্তা (Vanta) হেড অব স্টোরিটেলিং পদে নিয়োগ দিচ্ছে, যেখানে বার্ষিক বেতন ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৭৪ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা)। অন্যদিকে, ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার খুঁজছে একজন ফুড ব্র্যান্ড স্টোরিটেলার, যাঁর দায়িত্ব হবে বিভিন্ন মাধ্যমে খাবার ঘিরে আলাদা ও আকর্ষণীয় ধারণা তৈরি করা।
লিংকডইন–এর তথ্য বলছে, গত ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত আগের এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির বিজ্ঞাপনে ‘স্টোরিটেলার’ শব্দটির ব্যবহার আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন করপোরেট যোগাযোগের ধরন বদলে যাওয়ারই ইঙ্গিত। পণ্য ও প্রযুক্তি যত জটিল হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলোকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তত বেশি প্রয়োজন হচ্ছে স্পষ্ট, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য গল্পের। ফলে প্রচলিত বিজ্ঞাপন বা কপিরাইটিংয়ের বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস তৈরির দিকে ঝুঁকছে।
এমনকি উৎপাদনশীলতা বিষয়ক অ্যাপ নোশন তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, বাহ্যিক যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইনফ্লুয়েন্সার টিম একত্র করে একটি স্টোরিটেলিং ইউনিট গঠন করেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মানবসভ্যতার প্রাচীনতম দক্ষতা—গল্প বলা—আজ করপোরেট কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে। তবে গল্পের শেষে ‘তারা সুখে–শান্তিতে বসবাস করল’—এমন সমাপ্তি থাকবেই, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।