একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়াটা ছিল একটি ক্রমবর্ধমান সুযোগের ক্ষেত্র। বিশেষ করে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ছিল স্বপ্নের গন্তব্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা বলছে—এই পথ যেন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
গত দুই বছরে কানাডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা পাওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যেখানে একসময় প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর পড়তে যেত, তা এখন নেমে এসেছে দুই হাজারের নিচে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর ভিসা অনুমোদনের হার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য, যারা তুলনামূলকভাবে সহজ গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত ছিল, তারাও এখন কঠোর অবস্থানে। গত ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি আবেদনকারীদের প্রায় ৫২ শতাংশ ভিসা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার জন্য আশার কথা হচ্ছে, এই বছর তারা রেকর্ড পরিমাণ ভিসাও দিয়েছে। অযৌক্তিকভাবে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে ভিসা রিজেক্ট হচ্ছে। যুক্তরাজ্যেও গত কোয়ার্টারে প্রায় ৩০ শতাংশ আবেদন বাতিল হয়েছে এবং ১০টির মতো জনপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ থেকে সাময়িকভাবে শিক্ষার্থী নেওয়া স্থগিত করেছে। কারণ, যুক্তরাজ্য জুন মাস থেকে নতুন কোয়ালিটি ফ্রেমওয়ার্ক চালু করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য।
গত কয়েক বছরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ভিসা পেতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ বেড়েছে।
এ পরিস্থিতি কি শুধুই গন্তব্যদেশগুলোর নীতির পরিবর্তনের ফল? নাকি আমাদের নিজেদের ভেতরেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে?
১. বৈশ্বিক অভিবাসন নীতির কঠোরতা—
কোভিড-পরবর্তী সময়ে উন্নত দেশগুলো তাদের অভিবাসন নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার রক্ষা, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক চাপ—এই তিনটি বড় কারণ।
বিশেষ করে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া সাম্প্রতিক সময়ে ‘জেনুইন স্টুডেন্ট’ যাচাইয়ে অনেক বেশি কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ফলে শুধু পড়াশোনার উদ্দেশ্য নয়, আবেদনকারীর সামগ্রিক প্রোফাইল (একাডেমিক গ্যাপ, ফিন্যান্সিয়াল স্ট্রেংথ, ক্যারিয়ার প্ল্যান) গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
২. ‘স্টুডেন্ট’ না ‘মাইগ্র্যান্ট’—বিশ্বাসের সংকট—
অনেক দেশের কাছে এখন একটি বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ থেকে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁরা কি সত্যিই শিক্ষার্থী, নাকি সম্ভাব্য স্থায়ী অভিবাসী?
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী ভিসা নিয়ে গিয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন না করে অন্য পথে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই প্রবণতা সামগ্রিকভাবে একটি ‘ট্রাস্ট ডিসিট’ তৈরি করেছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের ওপরও।
৩. এজেন্ট ও আবেদনপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা—
বাংলাদেশে স্টাডি অ্যাব্রড সেক্টরের দ্রুত বিস্তার হলেও এর মাননিয়ন্ত্রণ এখনো দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে—
—ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে আবেদন
—যথাযথ ডকুমেন্টেশন না থাকা
—শিক্ষার্থীর প্রোফাইলের সঙ্গে কোর্সের অসামঞ্জস্য
এসব কারণে ভিসা অফিসারদের কাছে আবেদনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমে যাচ্ছে।
৪. শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি—
শুধু আইইএলটিএস স্কোর বা অফার লেটারই এখন যথেষ্ট নয়।
ভিসা অফিসাররা খুঁজছেন:
*পরিষ্কার ক্যারিয়ার পরিকল্পনা
*কোর্সের যৌক্তিকতা
*দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা
অনেক আবেদনেই এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয় না, ফলে প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি বাড়ে।
৫. জিওপলিটিক্যাল বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক চাপ—
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশগুলোকে আরও সংরক্ষণশীল করে তুলছে। স্থানীয় জনগণের জন্য সুযোগ নিশ্চিত করতে গিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।
সমাধানের পথ কোথায়?—
এই চ্যালেঞ্জকে শুধু বাইরের দোষ দিয়ে এড়িয়ে গেলে চলবে না। কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ জরুরি:
১. প্রোফাইল-ভিত্তিক আবেদন নিশ্চিত করা—
শিক্ষার্থীর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, কাজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোর্স নির্বাচন।
২. এজেন্সির জবাবদিহি বৃদ্ধি—
পেশাদারত্ব ও নৈতিক মান নিশ্চিত করা জরুরি।
৩. শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি—
‘সহজে ভিসা’ বা ‘শর্টকাট’ মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
৪. সরকার ও স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়—
স্টাডি অ্যাব্রড ইন্ডাস্ট্রিকে একটি স্ট্র্যাটেজিক খাত হিসেবে দেখা এবং নীতিগত সহায়তা প্রদান।
শেষ কথা—
পৃথিবী ছোট হচ্ছে—প্রযুক্তির কারণে, সংযোগের কারণে। কিন্তু সুযোগের দরজা সব ময় খোলা থাকে না। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ এখন দ্বিমুখী—একদিকে বৈশ্বিক নীতির কঠোরতা, অন্যদিকে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের প্রয়োজন। এটা শুধুই ‘তাদের সমস্যা’ নয়, আবার পুরোপুরি ‘আমাদের কর্মফল’ও নয়; বরং এটি একটি যৌথ বাস্তবতা—যেখানে পরিবর্তনের দায়িত্বও যৌথ।
সঠিক প্রস্তুতি, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিই পারে এই সংকুচিত পথকে আবারও প্রশস্ত করতে।
লেখক: আনোয়ার হোসেন, হেড অব সেলস অ্যান্ড অপারেশন, আইডিপি এডুকেশন বাংলাদেশ