সাত সরকারি কলেজ
সাত সরকারি কলেজ

কলেজ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষায় সংকট ও সাত কলেজ আন্দোলন

কলেজ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার ঈপ্সিত মানোন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতার অভিঘাতে বাধাগ্রস্ত। নীতিনির্ধারণে অসামঞ্জস্যতা, অর্থায়নে বৈষম্য, মানবসম্পদের অপর্যাপ্ততা, একাডেমিক তত্ত্বাবধানের শৈথিল্য ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব—এসব উপাদান সম্মিলিতভাবে একটি স্থায়ী সংকটের জন্ম দিয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতির প্রথম দৃশ্যমান উপসর্গরূপে আবির্ভূত হয়েছে রাজধানী ঢাকার সাতটি কলেজকে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের আন্দোলন। প্রকৃতপক্ষে এটি কেবল সাত কলেজের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের দাবি নয়; বরং মানসম্মত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, একাডেমিক পরিবেশ, কার্যকর পরীক্ষার পদ্ধতি ও সময়মতো ফল প্রকাশ, পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ এবং স্বতন্ত্র একাডেমিক পরিচয়ের প্রত্যাশা থেকে উদ্ভূত একটি কাঠামোগত পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা, সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার মধ্যে বিরাজমান সুযোগ–সুবিধার সীমাহীন বৈষম্য নিরসনের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ১৩টি অনুষদ, ৮৪টি বিভাগ ও ১৩টি ইনস্টিটিউটে বিভক্ত। ২০২০–২১ পর্যন্ত প্রতি সেশনে আসনসংখ্যা ছিল ৭ হাজার ১২৫, তবে ২০২১–২২ সেশনে ১ হাজার ১৫ আসন কমিয়ে ৬ হাজার ১১০ করা হয়। এতে শিক্ষক–শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:২০ থেকে কমে ১:১৬ হয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩৭ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন প্রায় দুই হাজার। প্রতিটি বিভাগে শিক্ষার্থীর আসনসংখ্যা ৭০ থেকে ১৫০, বিপরীতে শিক্ষকের সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের চিত্র একেবারেই ভিন্নতর। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয় সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৬৩ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সালে শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয় ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ টাকা, যা ২০২১ সালে ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ১২৪ টাকা।

ফেনী সরকারি কলেজ ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী সরকারি কলেজ। উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি, অনার্স–মাস্টার্স মিলিয়ে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক পদ মাত্র ৮৯। শিক্ষক–শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:২৪৭ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে তীব্র শিক্ষকসংকটের কথা। কলেজটিতে ১৫টি বিষয়ে অনার্স ও সাতটি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স পড়ানো হয়। প্রতিটি বিভাগে শিক্ষার্থী আসনসংখ্যা ১২০ থেকে ২২০, বিপরীতে শিক্ষকসংখ্যা ৪ থেকে ১২।

রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাতটি সরকারি কলেজে ১ লাখ ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ১ হাজার ১০০ শিক্ষক কর্মরত আছেন। রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতি ভিন্নতর নয়। বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, নোয়াখালী সরকারি কলেজ কিংবা সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ—এসব ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৩ থেকে ২৭ হাজার, বিপরীতে শিক্ষকের সংখ্যা ১০০ থেকে ১৮০। অর্থাৎ কলেজে শিক্ষকসংকটের চিত্র রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সমভাবে প্রযোজ্য। একদিকে শিক্ষকসংকট, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থীর চাপ কলেজগুলোয় শিক্ষক–শিক্ষার্থীর অনুপাত ক্রমেই বাড়ছে। ব্যানবেইসের ২০১৮ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী অনুপাত যেখানে ১:৭৯ ছিল, ২০২৪ সালের রিপোর্টে সেটা বেড়ে ১:৯৭ হয়েছে। মানসম্মত পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাতই শেষ কথা নয়। কেননা, পাঁচজন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে যে প্রস্তুতি নিতে হয়, ১০০ জনের জন্যও সেই একই প্রস্তুতি নিতে হয়। মূল বিষয়টি হচ্ছে একজন শিক্ষককে কয়টি কোর্স পড়াতে হচ্ছে। জনবলসংকটের কারণে ৬ থেকে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন কোর্স পড়াতে হলে একজন শিক্ষকের জন্য প্রত্যাশিত মানের পাঠদান দুরূহ হয়ে ওঠে।

কলেজ শিক্ষার মানোন্নয়নে ও জনবলসংকট কাটাতে ১৯৮৩–৮৪ সালে ব্রিগেডিয়ার এনাম আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত মার্শাল ল কমিটি অন অর্গানোগ্রাম বা এনাম কমিটির সুপারিশমতে, এইচএসসি ও ডিগ্রি (পাস) কলেজের জন্য প্রতি বিষয়ে চারটি, এইচএসসি, ডিগ্রি (পাস) ও স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের কলেজের জন্য সাতটি এবং এইচএসসি, ডিগ্রি ও শুধু মাস্টার্স পর্যায়ের কলেজের জন্য ৯টি শিক্ষক পদের প্রস্তাব করা হয়। পরে তা বাড়িয়ে ১২টি (একটি অধ্যাপক, তিনটি সহযোগী অধ্যাপক, চারটি সহকারী অধ্যাপক ও চারটি প্রভাষক) করা হয়। ১৯৮৭ সালের সমীক্ষা কমিটির স্টাফিং প্যাটার্ন অনুযায়ী কলেজগুলোকে এ, বি, সি ও ডি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়। উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (পাস ও সাবসিডিয়ারি), স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর কোর্স পড়ানো হয় এমন কলেজগুলোয় প্রতিটি বিষয়ে মোট শিক্ষক পদ হবে ১৬টি (দুটি অধ্যাপক, তিনটি সহযোগী অধ্যাপক, পাঁচটি সহকারী অধ্যাপক ও ছয়টি প্রভাষক)। উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (পাস ও সাবসিডিয়ারি) ও স্নাতক (সম্মান) হলে ১০টি এবং উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (পাস ও সাবসিডিয়ারি) ও শুধু স্নাতকোত্তর হলেও ১০টি পদের প্রস্তাব করা হয়েছে। ইংরেজি ও বাংলা বিষয়ের জন্য অতিরিক্ত একটি করে প্রভাষক পদ যুক্ত হবে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ের জন্য কলেজের শ্রেণিভেদে পদ হবে তিন থেকে সাতটি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রণীত পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, ২০২০ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয় ছিল মাত্র ১ হাজার ১৫১ টাকা। পরবর্তী বছরে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৭৪৩ টাকায় এবং ২০২২ সালে আরও নিম্নগামী হয়ে ৭০২ টাকায় অবনমিত হয়। মাসিক হিসাবে এ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৫৮ টাকার সামান্য অধিক, যা উচ্চশিক্ষা পরিচালনার বাস্তব ব্যয়ের প্রকৃতির তুলনায় বিস্ময়করভাবে অপ্রতুল।

অপর দিকে দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের চিত্র একেবারেই ভিন্নতর। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয় সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৬৩ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সালে শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয় ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ টাকা, যা ২০২১ সালে ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ১২৪ টাকা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৭৭৮ টাকায়, পূর্ববর্তী বছরে যা ছিল আনুমানিক দেড় লাখ টাকা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ৩ লাখ ১৪ হাজার ৪৭৭ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকার কিছু বেশি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ব্যয় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৭০ টাকা, যেখানে আগের বছরে তা ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৯২৪ টাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি বরাদ্দ ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের ১ লাখ ৬২ হাজার টাকার তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় অধিক্ষেত্র কলেজগুলোয় শিক্ষার্থীপ্রতি বরাদ্দের এই নিম্নমাত্রা উচ্চশিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ, গবেষণার পরিসর, অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও একাডেমিক উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতা—সবকিছুকেই সীমাবদ্ধ করেছে। অতএব কলেজগুলোর জন্য একটি সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক ও ন্যায়সংগত অর্থায়নের কাঠামো প্রণয়ন অনিবার্য। অন্যথা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন কেবল প্রত্যাশার স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

কলেজ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে কমপক্ষে এমএল (এনাম) কমিটি, ১৯৮৩ ও সমীক্ষা কমিটি, ১৯৮৭–এর সুপারিশকৃত স্টাফিং প্যাটার্ন অনুযায়ী শিক্ষকসংখ্যা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কলেজে নির্দিষ্ট জনবলসংকট থাকলে, সেখানে অনার্স–মাস্টার্স না রাখাই শ্রেয়। জনবল বৃদ্ধি সময়সাপেক্ষ এবং অর্থসংশ্লিষ্ট, সে ক্ষেত্রে পাশাপাশি অবস্থিত কলেজগুলোর জনবল সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর চালু রাখা যেতে পারে।

বাংলাদেশের কলেজ শিক্ষার্থীরা অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, আবাসন, পরিবহন, শিক্ষার্থীপ্রতি বরাদ্দ, সমাবর্তন, ক্লাস রুটিন, সিলেবাস, মানোন্নয়ন, পরীক্ষাব্যবস্থা, ফলাফলসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। এসব বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির কয়েক মাস পরেই ফল প্রকাশ ও নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নামেন অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা।

ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অসংগতি, প্রশাসনিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বারবার রাস্তায় নামতে হয়েছে। পূর্বপ্রস্তুতিবিহীন লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর অধিভুক্তির চাপে নুইয়ে পড়া পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, রেজিস্ট্রার ও বিভাগগুলো তথা সাত কলেজ নিয়ন্ত্রণকারী গোটা ঢাবি প্রশাসন অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা যারপরনাই ভোগান্তিতে পড়েন এবং একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ২০২৪ সালের শেষ দিকে শিক্ষার্থীরা ঢাবি অধিভুক্তি বাতিল করে স্থায়ী সমাধানের খোঁজে রাজপথ বেছে নেন।

শুরুতে সাত কলেজের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, অধিভুক্ত কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো ও পৃথক প্রশাসনিক ভবন গড়ে তোলা। পরে সেটি রূপ নেয় সাত কলেজকেন্দ্রিক স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে।

অতএব সাত কলেজ আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা না করে কলেজ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গভীরতর নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবে অনুধাবন করা অধিক যুক্তিসংগত। কেননা, একই সমস্যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অধিভুক্ত কলেজগুলোয়ও প্রকট। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মান নিয়ে আপত্তি তুলেছেন স্বয়ং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভিসি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যর্থতায় সাত কলেজ ঢাবি অধিভুক্ত করা হয়েছিল। কয়েক লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর ভারে ভারাক্রান্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি বাবদ উত্তোলিত অর্থ মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা খাত বা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় না করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়, যা অভিভাবকমহলে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে ও ব্যবস্থাপনাজনিত সংকট নিরসনে কোষাগারে অর্থ প্রদান নয়; বরং খাতভিত্তিক সুষম অর্থায়ন প্রয়োজন, সেই সঙ্গে প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। নতুবা এ ধরনের সংকট পুনরাবৃত্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। বিরাজমান বৈষম্য নিরসন না হলে বিভাগীয় ও জেলা শহরের কলেজগুলোয় অদূর ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সে জন্য কলেজগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক ক্যাম্পাসগুলোর নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে উঠতে যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ অর্থাৎ বিভাগীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা গতিশীল ও যুগোপযোগী করতে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক পদগুলোয় শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ কলেজের শিক্ষকদেরই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

সাত কলেজের বিষয়টি যেহেতু চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে, সে ক্ষেত্রে বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদগুলোয় বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার থেকে পদায়নের বিষয়টি আমলে নেওয়া যেতে পারে। উক্ত দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে সরকারি কলেজ শিক্ষকেরা বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে পাঠদানকারী শিক্ষকদের উপাচার্য হওয়ার সুযোগ নেই। তাঁরা আরও মনে করেন, ‘চিকিৎসকেরা, এমনকি সমরবিদ্যায় পারদর্শী সেনাবাহিনীও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরের পর বছর পাঠদান করেও সরকারি কলেজ শিক্ষকেরা কেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হতে পারছেন না? ভিসি তো কোনো একাডেমিক পদ নয়, এটি শিক্ষা প্রশাসন–সংশ্লিষ্ট পদ।’ ইতিমধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪–২৫ সেশনের ভর্তি পরীক্ষা সফলভাবে পরিচালনা করে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়েছেন। সাত কলেজকে নিতান্ত বাধ্য হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত নিতে হলে সাত কলেজের জন্য স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণ করে সেখানে বিদ্যমান প্রশাসক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার আদলে সরকারি কলেজ শিক্ষকদের সমন্বয়ে প্রশাসক, রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ স্বতন্ত্র ইউনিট গঠন করা যেতে পারে।

*লেখক: সচিব তালুকদার ও মনিরুজ্জামান, শিক্ষক