তুমি কি কখনো চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) বা ক্লাউডকে (Claude) জিজ্ঞাসা করেছ, ‘বাংলাদেশের রাজধানী কোথায়?’ আর সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পেয়েছ, ‘ঢাকা’? খুব চমৎকার, তাই না? মনে হচ্ছে, এআই যেন সব জানে! কিন্তু একটু থামো। সে কি সত্যিই জানে? নাকি সে শুধু অনুমান করছে যে তোমার প্রশ্নের পরে কোন শব্দটি আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তোমাকে বলছি, নিচের বাক্যটি মনে মনে পড়ো—
‘বাংলাদেশের রাজধানী হলো...’
এই ফাঁকা জায়গায় কোন শব্দটি আসবে? তোমার মাথায় প্রথমেই এসেছে ঢাকা। ‘চট্টগ্রাম’ বা ‘বাংলাদেশ’ আসেনি, তাই না? এআইও ঠিক এটিই করে। তবে এটি করে সংখ্যার জাদু দিয়ে—সম্ভাবনার হিসাব করে।
সম্ভাবনা মানে হলো, কোনো একটি ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কত, সেটা ০ থেকে ১–এর মধ্যে প্রকাশ করা। মনে করো, একটা মুদ্রা ছুড়লে head আসার সম্ভাবনা = ১/২ = ০.৫ । একটি ছক্কায় ৩ আসার সম্ভাবনা = ১/৬ ≈ ০.১৬৭ । গাণিতিকভাবে লিখি—
এখন প্রশ্ন হলো, এআই কীভাবে এটি ব্যবহার করে? ধরো, এআই লাখ লাখ বাংলা বাক্য পড়েছে। সেগুলোর মধ্যে:
‘বাংলাদেশের রাজধানী হলো ঢাকা’—এই বাক্য এসেছে ১০ হাজার বার
‘বাংলাদেশের রাজধানী হলো চট্টগ্রাম’—এসেছে মাত্র ২ বার
‘বাংলাদেশের রাজধানী হলো পিৎজা’—এসেছে ০ বার
তখন এআই হিসাব করে:
এই P(B | A) মানে হলো, ‘A ঘটনা ঘটলে, B ঘটনাটি ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু’—একে বলে Conditional Probability বা শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনা। এআই তাই বলে, ‘ঢাকা’। কারণ, এর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, ৯৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ!
চলো, একটু মজার অ্যাকটিভিটি করি, নিচের প্রতিটি বাক্যে ফাঁকা জায়গায় কী আসবে:
১. ‘সূর্য ..... ওঠে’
২. ‘দুই আর দুই মিলে .....হয়’
৩. ‘বাঘ একটা হিংস্র .....’
তুমি কি প্রতিবার প্রায় একই উত্তর ভাবলে? এআইও তা–ই ভাবে।
৪. ‘প্রতিটি রাতের শেষে আসে .....’
এখানে তুমি বলবে, ‘ভোর’ বা ‘সকাল’। এআইও সেটাই বলবে। কিন্তু কোনো কবি লিখতেন, ‘নিঃসঙ্গতা’। এই পার্থক্যটি হলো এআইয়ের সীমা। সে সবচেয়ে সাধারণ উত্তর দেয়, সবচেয়ে সৃজনশীল উত্তর নয়।
আগের অংশে আমরা বলেছিলাম, এআই শুধু সবচেয়ে সাধারণ উত্তরটি দেয়। কিন্তু বাস্তবে, তুমি চাইলে এআইকে দিয়ে চমৎকার কবিতাও লেখাতে পারো! এটি কীভাবে সম্ভব? এখানেই আসে আরও একটি গাণিতিক ধারণা, যাকে এআইয়ের ভাষায় বলা হয়, Temperature বা তাপমাত্রা।
Temperature হলো এমন একটি প্যারামিটার, যা সম্ভাবনার হিসাবকে কিছুটা পাল্টে দেয়। যখন Temperature কম থাকে (যেমন শূন্য দশমিক ১), তখন এআই সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনার শব্দটিই বেছে নেয়। একে বলা হয় Greedy Decoding। কিন্তু যখন Temperature বাড়িয়ে দেওয়া হয় (যেমন শূন্য দশমিক ৮ বা এক দশমিক শূন্য), তখন এআইয়ের সম্ভাবনার তালিকা কিছুটা সমান হয়ে যায়। তখন সে হয়তো ৯৯ শতাংশ সম্ভাবনার ‘ভোর’ শব্দটি না নিয়ে, ১ শতাংশ সম্ভাবনার ‘নিঃসঙ্গতা’ শব্দটি বেছে নিতে পারে!
এআই এখানে Softmax নামের একটি গাণিতিক ফাংশন ব্যবহার করে, যা অনেকটা এ রকম—
এখানে T হলো Temperature। T–এর মান বড় হলে সব শব্দের সম্ভাবনাই কাছাকাছি চলে আসে, ফলে এআইয়ের গণ্ডির বাইরে গিয়ে নতুন ও সৃজনশীল বাক্য তৈরি করার সাহস পায়।
চলো, এখন দেখা যাক, এআই কীভাবে ‘শেখে’? এখানে আসে Statistics বা পরিসংখ্যানের কাজ। ধরো, তুমি ১০০টি বাক্য দেখলে যেগুলো শুরু হয় ‘আমি ক্ষুধার্ত’ দিয়ে:
এই টেবিলটিকে বলে Frequency Distribution, কোন শব্দটি কতটা ঘন ঘন আসে, তার পরিসংখ্যান। এআই লাখ লাখ বাক্য থেকে এ রকম কোটি কোটি টেবিল বানিয়ে ফেলে। আর যখন তুমি কিছু জিজ্ঞাসা করো, এআই সেই টেবিল দেখে সবচেয়ে বেশি সম্ভাব্য উত্তরটি দেয়।
আগে আমরা দেখেছি, এআই ঠিক আগের শব্দগুলো দেখে পরের শব্দ অনুমান করে। কিন্তু ধরো, একটি বেশ বড় বাক্য: ‘আমি অনেকক্ষণ কড়া রোদে ফুটবল খেলে খুব ঘেমে গেছি, তাই হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রিজ খুলে এক গ্লাস ঠান্ডা ..... ঢেলে খেলাম।’
এখানে ফাঁকা জায়গায় কী বসবে? ‘পানি’ বা ‘শরবত’, তা–ই তো? কিন্তু এআই কীভাবে বুঝবে? সে বাক্যের শুধু ঠিক আগের শব্দ ‘ঠান্ডা’ দেখেই উত্তর দেয় না। সে একজন গোয়েন্দার মতো বাক্যের শুরুর দিকের ‘রোদ’, ‘ফুটবল’, ‘ঘাম’ আর ‘ফ্রিজ’ শব্দগুলোর দিকে বিশেষ ‘মনোযোগ’ দেয়। এভাবেই অনেকগুলো ক্লু একসঙ্গে মিলিয়ে এআই সবচেয়ে সঠিক শব্দটি বের করে আনে।
2
তুমি হয়তো ভাবছ, এআই কি সত্যিই ‘ঢাকা’ বা ‘চট্টগ্রাম’ শব্দগুলো বোঝে? আসলে নয়। এআই কোনো ভাষা বোঝে না, সে বোঝে শুধুই সংখ্যা।
সে প্রতিটি শব্দকে বিশাল এক বহুমাত্রিক স্থানে একটি ভেক্টর হিসেবে সাজিয়ে নেয়। এই ভেক্টরগুলো শুধু সাধারণ সংখ্যা নয়, এগুলো শব্দের অর্থ ও সম্পর্ক ধারণ করে। গণিতের জ্যামিতি ব্যবহার করে এআই বুঝতে পারে কোন শব্দের সঙ্গে কোন শব্দের মিল আছে।
সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণটি হলো—
V⃗রাজা − V⃗পুরুষ + V⃗নারী ≈ V⃗রানি
অর্থাৎ ‘রাজা’ ভেক্টর থেকে ‘পুরুষ’ বৈশিষ্ট্যটি বাদ দিয়ে যদি ‘নারী’ বৈশিষ্ট্যটি যোগ করা হয়, তবে গণিতের হিসেবেই তা ‘রানি’ ভেক্টরের খুব কাছাকাছি চলে যায়! এভাবেই Statistics ও Linear Algebra–এর দারুণ এক সমন্বয়ে এআই ভাষার অর্থ বুঝতে শেখে।
তোমার কি এমন কোনো বন্ধু আছে, যে কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলেও এমন কনফিডেন্সের সঙ্গে বানিয়ে বানিয়ে উত্তর দেয়, যেন সেটাই শতভাগ সত্যি? এআইও ঠিক এই কাজ করে! যেহেতু এআইয়ের নিজস্ব কোনো ‘সত্য বা মিথ্যা’ বোঝার ক্ষমতা নেই, সে শুধু হিসাব করে কোন শব্দের পর কোন শব্দ বসার সম্ভাবনা বেশি। তাই তুমি যদি তাকে এমন কিছু জিজ্ঞাসা করো, যা সে কখনো পড়েনি, সে ‘আমি জানি না’ বলার বদলে খুব সুন্দর করে একটা মিথ্যা উত্তর বানিয়ে দিতে পারে। এটাকে বলে ‘AI Hallucination’। তার মানে, এআইয়ের আত্মবিশ্বাস অনেক, কিন্তু তার সব কথাই চোখ বুজে বিশ্বাস করা যাবে না!
তাহলে কি এআই মাঝেমধ্যে ভুল তথ্যও দিতে পারে? হ্যাঁ! ধরো, তুমি জিজ্ঞাসা করলে: ‘বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কে?’ এআই হয়তো বলবে, ‘তাজউদ্দীন আহমদ’ সঠিক! কিন্তু ধরো, তুমি জিজ্ঞাসা করলে খুব নতুন কোনো ঘটনা সম্পর্কে, যা এআই কখনো পড়েনি। তখন সে সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তরটি দেবে, যেটা সত্যি না–ও হতে পারে! মূলত এআই অনুমান করে সর্বোচ্চ সম্ভাবনার উত্তরটি, কিন্তু সর্বোচ্চ সম্ভাবনাটির মানে তা শতভাগ নিশ্চিত হবে, সেটি সত্য নয়।
তাহলে উত্তরটা কী? এআই কি বুদ্ধিমান? সে জানে না, সে অনুমান করে। তবে এত ভালোভাবে অনুমান করে যে মাঝেমধ্যে মনে হয়, সে জানে! Probability ও Statistics–এই দুটি ধারণা দিয়েই আধুনিক এআই গড়ে উঠেছে। আর এই গণিত তুমিও শিখতে পারো, শুধু একটু ধৈর্য ও কৌতূহল থাকলেই হয়। পরের বার যখন এআইয়ের সঙ্গে কথা বলবে, মনে মনে ভাববে, এই মুহূর্তে সে লাখ লাখ সম্ভাবনার মধ্য থেকে সবচেয়ে ভালো অনুমানটিই করছে। আর তুমি এখন জানো, সেই অনুমানের নাম Probability!