পর্দায় কখনো তাঁর সংলাপ কম, কখনো একেবারেই নেই। অথচ চোখের চাহনি, মুখের সূক্ষ্ম পরিবর্তন কিংবা কয়েক মুহূর্তের নীরবতাতেই তিনি বলে দেন অনেক কথা। পাশের বাড়ির সাধারণ যুবক, ধূর্ত চোর, ধর্মগুরু, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা ভয়ংকর খলনায়ক—চরিত্র যা-ই হোক, ফাহাদ ফাসিল সেটিকে করে তোলেন বিশ্বাসযোগ্য । মালয়ালম থেকে তামিল ও তেলেগু—ভারতীয় সিনেমায় নিজের জন্য তিনি তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র এক অভিনয়ভুবন।
আজ এই অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৮২ সালের ৮ আগস্ট ভারতের কেরালায় জন্ম তাঁর। ক্যারিয়ারের শুরুতেই ব্যর্থ হয়ে অভিনয় ছেড়েছিলেন। সাত বছর পর ফিরে এসে হয়েছেন ভারতের অন্যতম প্রশংসিত অভিনেতা। অথচ প্রায় দুই যুগের ক্যারিয়ার ও অসংখ্য আলোচিত চরিত্রের পরও নিজেকে সফল বলতে রাজি নন ফাহাদ। কয়েক বছর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যারিয়ার, ব্যর্থতা ও জীবনদর্শন নিয়ে কথা বলেছিলেন তিনি। জন্মদিনে জেনে নেওয়া যাক জীবন ও সাফল্যকে কীভাবে দেখেন ফাহাদ ফাসিল।
‘ভাগ্যের লিখনে আমি বিশ্বাসী’
ভাগ্যে প্রবল বিশ্বাস ফাহাদের। তাঁর ধারণা, জীবনে যা কিছু ঘটেছে, সবই যেন আগে থেকে লেখা ছিল। খ্যাতিমান নির্মাতার ছেলে হয়েও প্রথম ছবিতে ব্যর্থ হওয়া, অভিনয় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া, আবার অভিনয়ের কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দেশে ফিরে দর্শকের ভালোবাসা পাওয়া—সবকিছুকেই ভাগ্যের অংশ মনে করেন তিনি ।
ফাহাদ বলেছিলেন, ‘ভাগ্যের লিখনে আমি বিশ্বাসী। তা না হলে কীভাবে বোঝাব—খ্যাতিমান মা–বাবার সন্তান হয়েও প্রথম ছবিতে ব্যর্থতা, তারপর অভিনয় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে দর্শন পড়া, অভিনয় না করার ইচ্ছা নিয়ে দেশে ফিরেও দর্শকের এমন ভালোবাসা!’
ফাহাদের অভিনয়ে অভিষেক মাত্র ২০ বছর বয়সে। ২০০২ সালে বাবা ফাসিলের পরিচালনায় রোমান্টিক–কমেডি ‘কাইয়েথুম দুরাথ’–এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। কিন্তু ছবিটি বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। তাঁর অভিনয় নিয়েও তীব্র সমালোচনা ও কটাক্ষ শুরু হয়।
ব্যর্থতায় অভিমানী ফাহাদ সিনেমা ছেড়ে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন। দীর্ঘ সাত বছর পর ২০০৯ সালে ভারতে ফিরে এলেও ক্যারিয়ার কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। তাঁর বন্ধুদের অনেকেই চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় কাজ করতেন। তাঁদের উৎসাহেই আবার অভিনয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। অ্যান্থলজি সিনেমা ‘কেরালা ক্যাফে’র একটি গল্পে সাংবাদিকের চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় ইনিংস ।
শোনা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় প্রয়াত বলিউড অভিনেতা ইরফান খানের একটি ছবি দেখে নতুন করে অভিনয়ে ফেরার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ফাহাদ। ইরফানের স্বাভাবিক অভিনয় তাঁকে বুঝিয়েছিল, পর্দায় নায়কোচিত উপস্থিতির চেয়েও একটি চরিত্রকে সত্য করে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় ইনিংসেই বদলে গেল গল্প
২০১১ সালে ‘চাপ্পা কুরিশু’ দিয়ে প্রথম বড় সাফল্যের স্বাদ পান ফাহাদ। ছবিটির জন্য কেরালা রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি অর্জন করেন। পরের বছর মুক্তি পাওয়া ‘টুয়েন্টি টু ফিমেল কোট্টায়াম’ ও ‘ডায়মন্ড নেকলেস’ অভিনেতা হিসেবে তাঁর জায়গা আরও শক্ত করে।
২০১৪ সালে অঞ্জলি মেননের ‘বেঙ্গালোর ডেজ’ বক্স অফিসে সাফল্য পায়। একই সঙ্গে দর্শকের মন কাড়ে ফাহাদের অভিনয়। এরপর ‘মহেশিন্তে প্রতিকারম’, ‘টেক অফ’, ‘থন্ডিমুথালুম দৃকসাক্ষীয়ুম’, ‘নিয়ান প্রকাশন’ ও ‘ট্রান্স’–এর মতো সিনেমা তাঁকে মালয়ালম চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা অভিনেতার আসনে নিয়ে যায়।
‘থন্ডিমুথালুম দৃকসাক্ষীয়ুম’–এ অভিনয়ের জন্য ২০১৮ সালে সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান ফাহাদ। ছবিটিতে এক রহস্যময় চোরের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
মহামারির সময় ভারতের আঞ্চলিক সিনেমার দর্শক যখন দ্রুত বাড়ছিল, তখন সর্বভারতীয় দর্শকের কাছে নতুনভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন ফাহাদ। প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকায় তাঁর কয়েকটি ছবি সরাসরি ওটিটিতে মুক্তি পায়। ‘সি ইউ সুন’, ‘জোজি’ ও ‘ইরুল’ দেখে ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে।
মালয়ালমের গণ্ডি পেরিয়ে
২০১৯ সালে ‘সুপার ডিলাক্স’ দিয়ে তামিল সিনেমায় অভিষেক ঘটে ফাহাদের। ছবিটিতে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায়। অনেক সমালোচকের বিবেচনায় সে বছর ভারতের সেরা ছবিগুলোর একটি ছিল ‘সুপার ডিলাক্স’।
২০২১ সালের আলোচিত তেলেগু ছবি ‘পুষ্পা: দ্য রাইজ’–এ ভানওয়ার সিং শেখাওয়াত চরিত্রে অল্প সময়ের উপস্থিতিতেই আলাদা করে নজর কাড়েন ফাহাদ। সেটিই ছিল তাঁর প্রথম তেলেগু ছবি। পরের বছর তামিল ব্লকবাস্টার ‘বিক্রম’–এ অভিনয় করেও প্রশংসিত হন ।
২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পুষ্পা ২: দ্য রুল’–এও ফাহাদের অভিনয় আলোচিত হয় । এ ছাড়া ‘বরাথন’, ‘কুম্বলঙ্গি নাইটস’, ‘মালিক’, ‘আবেশম’ ও ‘বোগেনভিলিয়া’র মতো সিনেমা তাঁর অভিনয়জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে ।
মালয়ালমের বাইরে তামিল ও তেলেগু সিনেমায় নিয়মিত কাজ করলেও বলিউড নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি ফাহাদ। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তিনি যে ধরনের গল্প ও চরিত্রে কাজ করতে চান, সেগুলো মালয়ালম সিনেমাতেই পাচ্ছেন। তবে ভবিষ্যতে হিন্দি সিনেমায় অভিনয়ের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি।
ভাষার দেয়াল ভেঙেছে সাবটাইটেল
ফাহাদের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর সাবলীলতা। চরিত্রের জন্য নিজেকে দৃশ্যমানভাবে বদলে ফেলার চেয়ে তিনি চরিত্রটির মনোজগতে প্রবেশ করতে বেশি আগ্রহী। তাই সাধারণ যুবক থেকে খলনায়ক—সব চরিত্রেই তাঁকে স্বাভাবিক মনে হয়।
ছোট পর্দা ও সাবটাইটেলের সহজলভ্যতা আঞ্চলিক সিনেমাকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন ফাহাদ। এই পরিবর্তন নিয়ে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত। উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলীয় সিনেমা ‘সিটি অব গড’–এর কথা বলেছিলেন অভিনেতা।
ফাহাদের ভাষ্যে, ‘দেখুন, “সিটি অব গড”–এর কী হয়েছিল। ছবিটি ছিল একটি নির্দিষ্ট শহরকে কেন্দ্র করে, কিন্তু সারা বিশ্বের মানুষ সেটি দেখেছে, কয়েকবার করে দেখেছে, ভালোবেসেছে। আমিও কেরালার বন্ধুদের সঙ্গে দেখেছি। এটাই “গ্লোবাল” দর্শকের শক্তি ।’
এখনো যে ছবির অপেক্ষায়
প্রায় দুই যুগের ক্যারিয়ারে ৬০টির মতো ভারতীয় ছবিতে অভিনয় করেছেন ফাহাদ। অনেক ছবিতে তাঁর চরিত্রের দৈর্ঘ্য খুব বেশি ছিল না। তারপরও কখনো কখনো প্রধান চরিত্রের চেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে তাঁকে নিয়ে। তবে এত অর্জনের পরও নিজের অভিনয়ে তৃপ্ত নন তিনি।
ফাহাদের ভাষায়, তিনি এখনো অসাধারণ কিছু করে ফেলেননি। অভিনেতা বলেছিলেন, ‘এখনো সেই ছবির অপেক্ষায় আছি, যার পর আমি আমার সাফল্যের কথা বলতে পারব।’
নতুন কোনো চরিত্র হাতে পাওয়ার পর নিজেকে প্রথমেই একটি প্রশ্ন করেন ফাহাদ—‘এটা কি দেশের মানুষের মনে দাগ কাটবে?’ চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গল্প, নির্মাতা কিংবা চরিত্রের দৈর্ঘ্যের পাশাপাশি এই প্রশ্নও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যারিয়ারের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেও প্রথম ছবির ব্যর্থতা ভুলে যাননি ফাহাদ; বরং সেই অভিজ্ঞতাকেই নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা মনে করেন। তাঁর কথায়, ‘জীবনের ওই অভিজ্ঞতা আমাকে মাটিতে পা রাখতে শিখিয়েছে।’
স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়ার জীবন
অভিনয়ের পাশাপাশি অনাড়ম্বর জীবনযাপনের কারণেও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছেন ফাহাদ। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁর অভিনীত ‘মারিসান’ মুক্তি পায়। ছবিটির প্রচারণার একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে বাটন ফোন ব্যবহার করতে দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়।
পরে হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফাহাদ জানান, স্মার্টফোন থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। প্রায় এক বছর ধরে ব্যবহার করছেন ‘ডাম্ব ফোন’ বা সাধারণ বাটন ফোন। ভবিষ্যতে সেটিও ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা তাঁর।
ফাহাদ বলেছিলেন, ‘এক বছর ধরে আমি ডাম্ব ফোন ব্যবহার করছি। পরিকল্পনা হচ্ছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে মুঠোফোন ব্যবহার করা ছেড়ে দেব। শুধু ই–মেইলেই পাওয়া যাবে আমাকে। স্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি। যদিও আমি নিশ্চিত নই, শেষ পর্যন্ত এটা সম্ভব হবে কি না!’
স্মার্টফোন ব্যবহার না করলেও ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নন ফাহাদ। প্রয়োজন হলে কম্পিউটার বা ল্যাপটপে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তবে কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি নেই।
একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলেও সেখানে কী পোস্ট করবেন কিংবা মন্তব্য করবেন, তা বুঝে উঠতে পারতেন না বলে জানিয়েছেন ফাহাদ। ব্যক্তিগত জীবনের কোনো কিছু যেন প্রকাশ্যে না আসে, সে বিষয়েও সব সময় সতর্ক ছিলেন।
এখন সময়কে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোই ফাহাদের লক্ষ্য। জীবনকে একটি নির্দিষ্ট রুটিনে আনতে চান, যাতে আরও বেশি কাজে মনোযোগ দিতে পারেন। অপ্রয়োজনীয় কোনো কিছু যেন তাঁর মনোযোগ কেড়ে নিতে না পারে, সে কারণেই স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে এই দূরত্ব।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না থাকায় নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয় নেই ফাহাদের। এ বিষয়ে উত্তরও তাঁর অভিনয়দর্শনের মতোই সরল ও আত্মবিশ্বাসী—‘যেদিন থেকে আমি খারাপ সিনেমা করা শুরু করব, শুধু তখনই আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব। অন্য কোনো কিছুই আমাকে দর্শকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।’