‘এক দো তিন’ থেকে ‘দোলা রে দোলা’—বলিউডের অনেক কালজয়ী নাচের পেছনের মানুষ তিনি। তবে পর্দায় তাঁর গান দর্শকদের আনন্দ দিলেও এই কোরিওগ্রাফারের জীবন ছিল সংগ্রামের। পর্দার আড়ালে থাকা সেই সরোজ খানের গল্প জানেন কম মানুষই।
দুই হাজারের বেশি ছবিতে কোরিওগ্রাফি, তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—সবকিছুর আগে সরোজ খানকে খুব অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
ছায়ার সঙ্গে খেলা, সেখানেই শুরু
প্রকৃত নাম ছিল নির্মলা নাগপাল। মাত্র তিন বছর বয়সে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে নাচের মতো ভঙ্গি করতেন। পরিবার ভেবেছিল, হয়তো শিশুটি মানসিকভাবে অসুস্থ। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসকের কাছে। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর সেই চিকিৎসকের মন্তব্য ছিল, ‘ও অসুস্থ নয়, ও নাচছে।’ এই একটি বাক্যই বদলে দেয় তাঁর জীবন। চিকিৎসকের পরামর্শে খুব ছোট বয়সেই চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন সরোজ। সরোজ নামটি তাঁর বাবার দেওয়া।
শৈশব হারিয়ে দায়িত্বের বোঝা
শিশুশিল্পী হিসেবে কয়েকটি ছবিতে কাজ করলেও বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ কমে যায়। ঠিক তখনই নেমে আসে বড় আঘাত—বাবার মৃত্যু। পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি পড়াশোনা করছিলাম, ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সংসার চালাতে আমাকে গ্রুপ ড্যান্সার হতে হয়।’
১২ বছরেই জীবনের মোড়
একটি ছবিতে হেলেনের সঙ্গে নাচতে গিয়ে সরোজ শুধু নিজের অংশই নয়, হেলেনের স্টেপও করে ফেলেন। বিষয়টি নজরে পড়ে নৃত্যপরিচালক সোহনলালের। তিনি সরোজকে পুরো গানে নাচতে বলেন, সরোজ তা নিখুঁতভাবে করে দেখান। সেদিনই মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি সোহনলালের সহকারী হয়ে যান। এটাই ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বড় বাঁক।
ভালোবাসা, যা পরিণত হয় যন্ত্রণায়
সোহনলাল ছিলেন সরোজের চেয়ে প্রায় ৩০ বছরের বড়। গুরু-শিষ্য সম্পর্ক ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সম্পর্কে গড়ায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে একদিন গলায় কালো সুতা পরিয়ে তাঁকে ‘বিয়ে’ করেন সোহনলাল। সরোজ বিশ্বাস করেছিলেন, তিনি বিবাহিত।
১৪ বছর বয়সেই মা হন সরোজ। কিন্তু পরে জানতে পারেন ভয়াবহ সত্য—সোহনলাল আগেই বিবাহিত এবং তাঁর চার সন্তান রয়েছে। তাঁদের এই সম্পর্ক কখনোই আইনি স্বীকৃতি পায়নি। সরোজ পরে বলেন, ‘আমি তখন বিয়ের মানে বুঝতাম না। তিনি গলায় সুতা পরালেন, আর আমি ভাবলাম আমি তাঁর স্ত্রী।’
নতুন জীবন, নতুন পরিচয়
১৯৭৫ সালে সরোজের জীবনে আসেন রোশন খান। তিনি বিয়ের প্রস্তাব দেন। সরোজ রাজি হন এক শর্তে—তাঁর সন্তানদের নিজের নামে গ্রহণ করতে হবে। রোশন খান সেই দায়িত্ব নেন। তাঁকে বিয়ে করতে গিয়ে সরোজ, যিনি জন্মসূত্রে পাঞ্জাবি হিন্দু ছিলেন, বৈবাহিক সূত্রে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এভাবেই তিনি নতুন পরিচয়ে নতুন জীবন শুরু করেন।
‘মাস্টারজি’ হয়ে ওঠা
কোরিওগ্রাফার হওয়ার স্বপ্ন কখনোই দেখেননি সরোজ। কিন্তু ভাগ্য আবারও তাঁকে নতুন পথে নিয়ে যায়। ‘দিল হি তো হ্যায়’ ছবির শুটিং চলাকালে সোহনলাল মাঝপথে বিদেশে চলে গেলে নির্মাতারা সরোজকে দায়িত্ব নিতে বলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি কাজটি করেন এবং সফল হন। পরে অভিনেত্রী সাধনা তাঁকে ‘গীতা মেরা নাম’ ছবিতে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর একক কোরিওগ্রাফারের যাত্রা।
তারকা তৈরির কারিগর
সরোজ খান শুধু নাচ শেখাতেন না, তিনি তারকা তৈরি করতেন। মাধুরী দীক্ষিত, শ্রীদেবী, ঐশ্বরিয়া রাই, কঙ্গনা রনৌত—অনেক তারকার পর্দার ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে তাঁর হাত ধরেই। তিনি একটি নাচের স্কুলও শুরু করেন, যেখানে নতুনদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। সেখানেই একসময় আসেন এক দরিদ্র তরুণ—গোবিন্দ। টাকা না থাকলেও সরোজ তাঁকে প্রশিক্ষণ দেন। পরে সফল হওয়ার পর গোবিন্দ তাঁকে ‘গুরুদক্ষিণা’ হিসেবে টাকা পাঠান।
যন্ত্রণা থামাতে পারেনি তাঁকে
ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক আঘাত এসেছে। এক মেয়েকে শৈশবে হারান, আরেক মেয়ে কুকু মারা যান ৩৯ বছর বয়সে। এরপর নাতি-নাতনিদের দায়িত্বও নেন তিনি। তবু কাজ থামাননি। ‘দেবদাস’ ছবির ‘দোলা রে দোলা’ গানের শুটিংয়ের সময় তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তবু মেঝেতে শুয়ে শুয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। পরিচালক সঞ্জয়লীলা বানসালি স্মৃতিচারণা করে বলেন, তিনি প্রচণ্ড ব্যথার মধ্যেও ১৫ দিন শুটিং চালিয়ে গেছেন।
অমর এক উত্তরাধিকার
দুই হাজারের বেশি ছবিতে কাজ, তিনটি জাতীয় পুরস্কার—এসব অর্জনই সরোজের পরিচয় নয়; তাঁর আসল পরিচয় তাঁর লড়াই।
সরোজ শোককে শক্তিতে, ব্যর্থতাকে সাফল্যে রূপ দিয়েছেন। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির প্রথম ঢেউয়ে তিনি মারা যান। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি—গান, নাচ, স্মৃতি—আজও বেঁচে আছে। মৃত্যুর আগে তিনি ভারতজুড়ে শতাধিক নাচের স্কুল গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল, পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় একটি করে নাচের স্কুল থাকবে। সেই স্বপ্ন সত্যি হবে কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে