সিনেমার দৃশ্যে দীপ্তি নাভাল। আইএমডিবি
সিনেমার দৃশ্যে দীপ্তি নাভাল। আইএমডিবি

বাড়ি থেকে পালানো, পরিচালকের সঙ্গে প্রেম, পর্দার বাইরে দীপ্তির অন্য জীবন

শান্ত চোখ। শ্যামবর্ণ। মৃদুভাষী। সত্তর ও আশির দশকে সমান্তরাল ছবিতে বলিউড অভিনেত্রী দীপ্তি নাভালের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। অভিনয়দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে সঠিক চরিত্রে নিজেকে সাজিয়েছেন দীপ্তি। নানা বৈচিত্র্যময় ঘটনায় সমৃদ্ধ এই অভিনেত্রীর জীবন; যার অনেকগুলো হয়তো আপনি জানতেন না।

শৈশব ও বাড়ি থেকে পালানো
দীপ্তি নাভালের জন্ম অমৃতসরে, এক ইংরেজি শিক্ষক পিতার ও চিত্রশিল্পী মায়ের ঘরে। ছোটবেলা থেকেই ছবির প্রতি তাঁর অনুরাগ গভীর। কাশ্মীরের চলচ্চিত্রগুলোতে যে সৌন্দর্য ও স্বাধীনতা দেখতেন, তার প্রভাবেই মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তাঁকে বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়। এই সাহসী ছোট্ট অভিযান দীপ্তির জীবনের সেই স্বাধীনচেতা মনোভাবের পরিচায়ক, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর সিনেমা ও শিল্পকর্মে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।


১৯৭১ সালে পিতার চাকরির কারণে পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়। সেখানে দীপ্তি চারুকলা, মনোবিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন। তিনি পরে কাজ শুরু করেন টেলিভিশন ও রেডিওতে। রেডিওতে শুরু করেন সঞ্চালনা, সেখানে তিনি রাজ কাপুর ও দিলীপ কুমারের মতো তারকার সাক্ষাৎকার নেন।

সিনেমার দৃশ্যে দীপ্তি নাভাল। আইএমডিবি

বলিউডে পদার্পণ
ভারতে ফিরে দীপ্তি নাভাল সিনেমাজগতে প্রবেশ করেন। তিনি রাজশ্রী ফিল্মসের সঙ্গে যুক্ত হন, পরিচয় হয় হেমন্ত কুমার, বাসু চ্যাটার্জি, হৃষিকেশ মুখার্জীর সঙ্গে। ‘চাশমে বাদ্দুর’, ‘সাথ সাথ, ‘কথা’ ও ‘অঙ্গুর’ সিনেমাগুলোতে অভিনয় করে তিনি ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’ হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর সহজ–সরল হাসি, মধ্যবিত্ত বাস্তবতার সঙ্গে মিলিত অভিনয় তাঁকে দর্শকদের কাছে আলাদা করে তোলে।

বিয়ে ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম
আশির দশকে দীপ্তি একটু জটিল চরিত্র আছে এমন সিনেমার প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি ছয় মাস সিনেমা বন্ধ রাখেন, যা শিল্পমহলে তাঁর প্রতি অবহেলার মনোভাব সৃষ্টি করে। এরপর তিনি চলচ্চিত্র ‘কমলা’–তে কাজ করেন, যেখানে তিনি প্রকাশ ঝার সঙ্গে পরিচিত হন। এই চলচ্চিত্র তাঁকে গভীর সিনেমার দিকে ফেরায়। আশির দশকের মাঝামাঝিতে প্রকাশ ঝার সঙ্গে দীপ্তির বিয়ে হয়। সেই সময় বলিউডে প্রথাগত ধারণা ছিল—বিবাহিত হলে নায়িকার ক্যারিয়ার শেষ। দীপ্তি এই পরিস্থিতিতে গভীর হতাশায় পড়েন। তিনি বলেন, ‘বিয়ের কিছু বছর পর বুঝতে পারলাম, সব ঠিকমতো চলছে না। সম্পর্কের মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় আমি খুব বিষণ্নতার মধ্যে ছিলাম।’

সিনেমার দৃশ্যে দীপ্তি নাভাল। আইএমডিবি

পরে দীপ্তি নিজের মতো করে পথ খুঁজে নেন। গ্যারেজে বসে ছবি আঁকতেন, প্রবন্ধ লিখে নিজের আবেগ ও হতাশা প্রকাশ করতেন। এই সময়ে তিনি বুঝতে পারেন, ব্যর্থতার অনুভূতি শিল্পীর জন্য মূল্যবান। দীপ্তি ও প্রকাশ ঝা ১৯৮৮ সালে দিশা নাভালকে দত্তক নেন। আজও তারা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। বিবিসি নিউজ হিন্দিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দীপ্তি জানান, ‘কমলা’, ‘আনকাহি’ এবং তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘হিপ হিপ হুররে’র সময় থেকেই প্রকাশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুরু হয়। সেই সময়ের বলিউডের মানসিকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যখন বিয়ে করি, তখনো বলিউডে প্রচলিত ধারণা ছিল যে নায়িকা বিয়ে করলে তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। যেন দোকান গুটিয়ে নিতে হবে। সবাই ধরে নিত যে বিয়ে হয়ে গেলে অভিনেত্রীর আর কাজ করার আগ্রহ থাকে না, ফলে ধীরে ধীরে কাজের প্রস্তাব আসা বন্ধ হয়ে যেত।’

দীপ্তি মনে করেন, তারকাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার মোকাবিলা করা আরও কঠিন, কারণ তাঁরা সব সময় জনসমক্ষে থাকেন এবং মানুষের কড়া নজরদারির শিকার হন। তাঁর কথায়, ‘আপনি যখন জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ে থাকবেন, তখন নিজেকেই সেই গভীর গর্ত থেকে টেনে তুলতে হবে। একজন সেলিব্রিটি হিসেবে আমি সব সময় সচেতন ছিলাম। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সাহায্য নিচ্ছি, এই খবর বাইরে গেলে মানুষ কী ভাববে? তাই আমি স্থির করেছিলাম, নিজের জোরে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসব।’

দ্বিতীয় প্রেম: বিনোদ পণ্ডিত ও ফিরে আসা
প্রকাশ ঝার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দীপ্তি নাভাল নতুন প্রেম খুঁজে পান অভিনেতা ও শাস্ত্রীয় গায়ক পণ্ডিত জসরাজের ভাইপো বিনোদ পণ্ডিতের সঙ্গে। তাঁরা টেলিভিশন সিরিজ ‘থোড়া সা আসমান’-এ একসঙ্গে কাজ করতেন। এই সম্পর্ক তাঁর সৃজনশীল শক্তিকে পুনর্জাগ্রত করে—চিত্রাঙ্কন, ফটোগ্রাফি, লেখালেখি।

দীপ্তি–বিনোদ পণ্ডিতের জীবন ছিল দুজনের জন্যই রোমাঞ্চকর—নিউইয়র্কের পাহাড়ে ভ্রমণ, শিল্পচর্চা, একসঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু বিনোদ পণ্ডিত ক্যানসারে মারা যান। দীপ্তি জানিয়েছেন, ‘তিনি যখন অসুস্থ ছিলেন, তবু তিনি আমার সেরাটা বের করেছেন। প্রথম ছবি প্রদর্শনী, ফটোগ্রাফি ও লেখালেখি—সবকিছুর পেছনে তাঁর উৎসাহ ছিল। হাসপাতাল বিল পরিশোধ করতে অভিনয়ে ফিরতে হয়েছিল।’

সিনেমার দৃশ্যে দীপ্তি নাভাল। আইএমডিবি

দীপ্তির সঙ্গে বারবার নাম জুড়েছে প্রয়াত অভিনেতা ফারুক শেখের নাম। বহু ছবিতে একসঙ্গে দেখা গিয়েছে ফারুক-দীপ্তিকে। ভীষণ ভালো বন্ধু ছিলেন দুজন। কিন্তু আটের দশকে জল্পনা উঠেছিল তাঁরা ডেট করছেন। তবে তা জল্পনাই ছিল, সত্যি হয়নি। ফারুক শেখের মৃত্যুর পর দীপ্তি এক ক্যানডিড ছবি পোস্ট করেন। দীপ্তি লেখেন, ফারুক ছিলেন বড় ‘ফ্লার্ট’। কিন্তু দীপ্তির সঙ্গে ফ্লার্ট করার চেষ্টাও করেননি। তাঁরা ভীষণ ভালো বন্ধু ছিলেন। দীপ্তির কাছের বন্ধু ছিলেন স্মিতা পাতিল ও শাবানা আজমি। এই ত্রিমূর্তি শুধু অন স্ক্রিনেই নন, অফ স্ক্রিনেই কাছের বন্ধু ছিলেন।

এক সাক্ষাৎকারে দীপ্তিকে প্রশ্ন করা হয়, সুযোগ পেলে কী কী ফিরিয়ে নিতেন জীবন থেকে? খুব একচোট হেসে নিয়ে বলেন, ‘বাড়ি ছেড়ে পালানোটা ভুল হয়েছিল। প্ল্যাটফর্ম থেকে আমায় কান ধরে ফিরিয়ে নিয়ে আসার পরে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর পালাব না। তবে কাশ্মীর দেখতে এখনো পালাই। সেবার প্রথম কাশ্মীর যাব বলেই ঘর ছেড়েছিলাম।’

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে