নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ইমেজের মধ্যে আটকে রাখতে চান না ইমরান হাশমি। তাই তিনি তাঁর অভিনয়জীবনে বারবার ধরা দিয়েছেন ভিন্ন ধারার চরিত্রে। বাস্তব ঘটনার প্রেরণায় নির্মিত ছবি হক-এ তাঁকে সবশেষ দেখা গেছে।
এই ছবি থেকে শুরু করে ফিটনেস, চরিত্র নির্বাচন ও দীর্ঘ অভিনয়জীবন সবকিছু নিয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন ইমরান। মুম্বাইয়ের এক পাঁচতারা হোটেলে আয়োজিত এই সাক্ষাৎকারে আরও তিন সাংবাদিকের সঙ্গে ছিলেন প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধিও।
বয়স তাঁর ৪৬। কিন্তু আজও ইমরানের ফিটনেস সবাইকে অবাক করে। এর রহস্য জানতে চাওয়া হলে অভিনেতা সোজাসাপটা জবাব দেন। ‘কোনো রহস্য নেই। আসলে আমার স্ত্রী আমাকে ঠিকমতো খেতে দেয় না’, হেসে বলেন অভিনেতা। তাঁর কথায়, ‘শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনই আসল। নিয়মিত শরীরচর্চা আর ডায়েট ঠিক থাকলে ফিট থাকা কঠিন নয়। ডায়েটটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি সব সময়ই ফিট ছিলাম, তবে এখন ছবির প্রয়োজনে নিজেকে আরও বেশি ফিট রাখতে হয়। এটা এখন আমার জীবনযাপনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
করোনা কালের প্রসঙ্গ টেনে ইমরান বলেন, ‘তখন মানুষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল, একদল যা খুশি খেতে শুরু করেছিল, আরেক দল ফিটনেসে মন দিয়েছিল। আমি দ্বিতীয় দলে ছিলাম। সেটার সুফল এখন ভরপুর পাচ্ছি।’
ইয়ামি গৌতম ও ইমরান অভিনীত হক ছবিটি ১৯৮০ সালে ঐতিহাসিক শাজিয়া বানো মামলা দ্বারা অনুপ্রাণিত। ছবিটি যেহেতু বাস্তব ঘটনার দ্বারা অনুপ্রাণিত, তাই দায়িত্ববোধের জায়গাটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ইমরান নিজেও। তাঁর ভাষায়, ‘এ ধরনের ছবিতে সবচেয়ে আগে দায়িত্বশীল হতে হয়, বিশেষ করে বিষয়টা সংবেদনশীল হলে। যাদের জীবনের ঘটনা থেকে গল্প অনুপ্রাণিত, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সংবেদনশীল থাকতে হয়। হক–এর জন্য আমরা অনেক রিসার্চ করেছি এবং বাস্তব কাহিনিকে যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করেছি।’
ইদানীং ইমরান হাশমিকে ধূসর চরিত্রে বেশি দেখা যাচ্ছে; এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই কোনো চরিত্রকে ধূসর বা নেতিবাচক হিসেবে দেখি না। চরিত্রকে বিচার করলে অভিনয়ে পক্ষপাত চলে আসে।’
সুপর্ণ ভার্মা পরিচালিত হক-এ ইমরান অভিনীত চরিত্রের নাম আব্বাস খান। শাজিয়া বানোর স্বামীর ভূমিকায় অভিনেতাকে দেখা গেছে। এই ছবিতে নিজের অভিনীত চরিত্রকে ঘিরে অভিনেতার মত, ‘আব্বাস নিজের বিশ্বাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ আর যুক্তির পক্ষে লড়েছে। দর্শক হিসেবে আপনি ভাবতে পারেন সে ভুল করছে, কিন্তু তার নিজের জায়গা থেকে সে ঠিক বলেই মনে করে। তাই আমি তাকে খলনায়ক ভাবি না। এটা আসলে তার দৃষ্টিভঙ্গির গল্প।’ সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে মিল খুঁজে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সমাজে অনেক মানুষ নিজেদের বিশ্বাসে এমনভাবে আবদ্ধ থাকেন যে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পান না। আব্বাসের চরিত্র সেখান থেকেই এসেছে।’
এই চরিত্রের প্রস্তুতির কথাও জানালেন ইমরান। তাঁর কথায়, ‘প্রথমেই বুঝতে চেয়েছিলাম পরিচালক আর লেখক কী বলতে চাইছেন। চরিত্রটা ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা একজন আইনজীবীর। এমন চরিত্র আমি আগে করিনি। আদালতের নিয়মকানুন, সংলাপের ভাষা—সবকিছু নিয়েই গবেষণা করেছি।’ তিনি জানান যে পরিচালক সুপর্ণ ভার্মার দিকনির্দেশনা তাঁর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ‘আদালতের মর্যাদা বজায় রেখেই দৃশ্যগুলো করেছি। অতিনাটকীয় হওয়ার পথে যাইনি আমরা,’ বললেন ইমরান।
একজন মুসলিম অভিনেতা হিসেবে এই ধরনের বিষয়বস্তুর ছবিতে কাজ করা কঠিন ছিল কি না, এই প্রশ্নে ইমরান স্বীকার করেন, ‘শুরুতে কিছুটা দ্বিধা ছিল। কারণ, দর্শক ভাবতে পারেন আমি একই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। আমি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম, ছবিতে কোনো সম্প্রদায়কে নেতিবাচকভাবে দেখানো হচ্ছে না। এই ছবির সঙ্গে দায়িত্বশীল মানুষেরা যুক্ত ছিলেন, সেটাই আমার ভরসার জায়গা ছিল। আমরা কোনো বিচার করিনি, শুধু ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছি।’
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে টিকে থাকার প্রসঙ্গে ইমরানের মত, ‘টিকে থাকতে হলে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়। আমি কখনো একঘেয়ে হতে চাইনি।’ তাঁর কথায়, ‘বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি কনটেন্টভিত্তিক ছবিও করেছি। শেষ পর্যন্ত গল্পই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে।’
এ কারণেই এখন তিনি আগের তুলনায় অনেক বেছে কাজ করেন বলে জানান ইমরান। ‘আগে বছরে চারটি ছবি করতাম, এখন এক বা দুটির বেশি করি না। সত্যি বলতে নিজেকে বারবার একইভাবে দেখানোর ভয় তাড়া করে। ৫০-এর বেশি ছবির পর নতুন কিছু খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন হয়ে যায়’, একটু ভেবে বলেন অভিনেতা।
আরিয়ান খান পরিচালিত ওয়েবসিরিজ দ্য ব্যা**ডস অব বলিউড-এ ইমরান অভিনীত দৃশ্যগুলো দর্শকের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। এ বিষয়ে ইমরান বলেন, ‘সত্যি বলতে প্রথমে আমি নিজেই অবাক হয়েছিলাম। আমার দৃশ্যগুলো এতটা ভাইরাল হবে ভাবিনি।’
সিরিজটির প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘শো-টা দারুণ হয়েছে। সবাই ভালো কাজ করেছেন, আর দর্শকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়ে সত্যিই ভালো লাগছে।’ শাহরুখ খানপুত্র আরিয়ান খানের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইমরান বলেন, ‘আরিয়ান খুবই পরিশ্রমী, মেধাবী, আর একজন ভালো অভিনেতাও।’