‘সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। এত বছর ধরে শ্রোতা হিসেবে আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, প্লেব্যাক ভোকালিস্ট হিসেবে আমি আর কোনো নতুন কাজ গ্রহণ করব না। এখানেই আমি এর ইতি টানছি। পুরো যাত্রা ছিল অসাধারণ।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত মঙ্গলবার রাতে অরিজিৎ সিংয়ের হঠাৎ দেওয়া এ পোস্টে স্তব্ধ বলিউডের সংগীত–দুনিয়া। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বলিউড ইন্ডাস্ট্রি—সবখানে একটাই প্রশ্ন: তবে কি সংগীত–দুনিয়া থেকেই বিদায় নিচ্ছেন অরিজিৎ সিং?
ধোঁয়াশা কাটালেন নিজেই
এক দশকে টালিউড-বলিউডের রোমান্টিক গানের সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন অরিজিৎ। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের সাদামাটা এই ছেলেটির কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছেন কোটি শ্রোতা। ফলে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে যাত্রা শেষ করার ঘোষণায় ভেঙে পড়ে হাজারো অনুরাগীর মন।
তবে খুব দ্রুত নিজেই ধোঁয়াশা কাটান অরিজিৎ। স্পষ্ট করে জানান, সংগীত থেকে তিনি বিদায় নিচ্ছেন না। লিখেছেন, ‘আমি সংগীত বন্ধ করছি না। একজন সংগীত অনুরাগী হিসেবে আরও শিখতে চাই, নতুন কিছু করতে চাই। এখনো কিছু প্রতিশ্রুতি বাকি আছে, সেগুলো অবশ্যই পূরণ করব। ২০২৬ সালে আমার গাওয়া কিছু গান মুক্তি পাবে।’
কোটিতে এক কণ্ঠ
নেটিজেনদের একাংশের ধারণা, বলিউডের দীর্ঘদিনের রাজনীতি ও দলাদলি তাঁকে হয়তো ক্লান্ত করে তুলেছে। ২০১৪ সালে এক অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে সালমান খানকে নিয়ে হালকা রসিকতা করার মাশুল অরিজিৎকে দিতে হয়েছিল, একাধিক ছবির গান থেকে বাদ পড়েন তিনি। সে সময় হতাশ হলেও হার মানেননি অরিজিৎ। পরে সালমান খানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। দীর্ঘ বিরতির পর টাইগার ৩-এ আবার শোনা যায় তাঁর কণ্ঠ। গুঞ্জন আছে, সালমান খানের আসন্ন ছবি ব্যাটল অব গালওয়ান-এর ‘মাতৃভূমি’ গানটিই হতে পারে তাঁর শেষ বলিউড প্লেব্যাক।
মুম্বাই নয়, জিয়াগঞ্জই পছন্দ
মুম্বাইয়ের ঝলমলে জীবন নয়, অরিজিতের পছন্দ জিয়াগঞ্জের নিরিবিলি পরিবেশ। স্কুটিতে চড়ে অলিগলি ঘোরা, পাড়ার যুবকদের সঙ্গে ক্রিকেট—এই সাদামাটা জীবনেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য। একসময় রিয়েলিটি শো ‘ফেম গুরুকুল’-এ অংশ নিয়েও সেরা পাঁচে জায়গা হয়নি। পরে মার্ডার ২-এর গান ‘ফির মহব্বত’ তাঁকে পরিচিতি দেয়। আর আশিকি ২-এর ‘তুম হি হো’ তাঁকে রাতারাতি তারকায় পরিণত করে।
সাফল্যের ঝুলি
দুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই শিল্পীর ঝুলিতে রয়েছে সাত শতাধিক গান। এর মধ্যে তিন শতাধিক হিন্দি এবং শতাধিক বাংলা গান। পাশাপাশি তামিল, তেলেগু, মারাঠিসহ নানা ভাষায় কণ্ঠ দিয়েছেন। প্লেব্যাক ছাড়ার ঘোষণার পর শ্রেয়া ঘোষাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এটা অরিজিতের ক্যারিয়ারের নতুন এক অধ্যায়। ও কী করতে যাচ্ছে, সেটা দেখার জন্য আমি ভীষণ উচ্ছ্বসিত।’ কুমার শানু বলেন, ‘এ খবর শুনে আমি সত্যিই কষ্ট পেয়েছি। তোমার কণ্ঠ কোটিতে একটি। এত কম বয়সে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসের জন্য আমি গর্বিত।’
সামনে কী করবেন
ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণে মন দিতে চান অরিজিৎ। ইতিমধ্যে তাঁর প্রথম হিন্দি ছবির কাজও শুরু হয়ে গেছে। স্ত্রী কোয়েল সিংয়ের সঙ্গে যৌথভাবে চিত্রনাট্য লিখছেন। ছবিটিতে অভিনয় করছেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী। শান্তিনিকেতনে চলছে ছবিটির শুটিং। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে, এমন কথা বেশ কয়েকবার বলেছেন। নিজের সংগীতগুরুর জীবন নিয়ে এর আগে একটি বাংলা ছবি প্রযোজনা ও পরিচালনাও করেছিলেন অরিজিৎ।
প্লেব্যাকের অধ্যায় শেষ হলেও অরিজিতের সংগীতযাত্রা যে থামছে না, তা স্পষ্ট। বরং পরিচিত গণ্ডির বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন পথ খুঁজতেই এই সাহসী সিদ্ধান্ত—এমনটাই মনে করছেন তাঁর অনুরাগীরা।