কে. ভাগ্যরাজ। এক্স থেকে
কে. ভাগ্যরাজ। এক্স থেকে

চলে গেলেন আলোচিত দক্ষিণি নির্মাতা

তামিল চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপলেখক কে. ভাগ্যরাজ মারা গেছেন। আজ শনিবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ৭৩ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তামিল সিনেমা হারাল এমন একজন নির্মাতাকে, যিনি প্রমাণ করেছিলেন, নায়ক হতে হলে অতিমানব হওয়ার প্রয়োজন নেই; সাধারণ মানুষও হতে পারে দর্শকের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার (কার্ডিওপালমোনারি অ্যারেস্ট) পর কে. ভাগ্যরাজকে দ্রুত চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন।
কে. ভাগ্যরাজ স্ত্রী পূর্ণিমা ভাগ্যরাজ, ছেলে শান্তনু ভাগ্যরাজ ও মেয়ে রণ্যাকে রেখে গেছেন।

সহকারী পরিচালক থেকে নির্মাতা
তামিলনাড়ুর তিরুপুর জেলার ভেল্লাকোভিলে জন্ম নেওয়া ভাগ্যরাজ চলচ্চিত্রজীবন শুরু করেন সহকারী পরিচালক হিসেবে। পরে কিংবদন্তি নির্মাতা ভারতীরাজার অধীনে কাজ করার সুযোগ পান। শোনা যায়, ভাগ্যরাজের হাতের লেখা ও গল্প বলার ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েই তাঁকে নিজের দলে টেনে নিয়েছিলেন ভারতীরাজা। পরে ‘পুথিয়া ভারপুগা’ ছবিতে স্কুলশিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগও দেন তিনি।

নিজের গল্পে নিজেই নায়ক
সত্তর ও আশির দশকে তামিল সিনেমা যখন কমল হাসান ও রজনীকান্তের তারকাখ্যাতিতে আলোকিত, তখন ভাগ্যরাজ সম্পূর্ণ ভিন্নপথে হাঁটেন।
কে. ভাগ্যরাজ নিজের ছবির গল্প নিজেই লিখতেন, পরিচালনা করতেন, প্রযোজনা করতেন—এমনকি অভিনয়ও করতেন। তাঁর ছবির শক্তি ছিল চিত্রনাট্য, সংলাপ এবং সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প।

‘মৌনা গীথাঙ্গল’, ‘আন্দা ৭ নাটকাল’, ‘ইনরু পোই নালাই ভা’, ‘ইধু নাম্মা আলু’—এসব ছবি আজও চলচ্চিত্রের শিক্ষার্থীদের কাছে চিত্রনাট্য নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তামিল সিনেমার নায়কের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন
ভাগ্যরাজের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত তামিল চলচ্চিত্রে নায়কের ধারণা বদলে দেওয়া। তাঁর নায়ক ছিলেন না অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী কোনো ব্যক্তি। বরং তিনি ছিলেন চশমা পরা, আত্মসমালোচনাপ্রবণ, ভুল করা, লাজুক অথচ বুদ্ধিমান এক সাধারণ মানুষ। ‘ইনরু পোই নালাই ভা’ ছবিতে তিন তরুণ এক তরুণীর মন জয়ের জন্য বীরত্ব দেখায় না; বরং তার পরিবারের নানা কাজ করে, অপমান সহ্য করে। আবার ‘ইধু নাম্মা আলু’ ছবিতে এক নাপিতের ছেলের সঙ্গে ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ের প্রেমের গল্পের মাধ্যমে জাতপাতের প্রশ্ন তুলে ধরেন তিনি।

এই বাস্তবধর্মী চরিত্রই ভাগ্যরাজকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। কঙ্গু অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা ও উপভাষা ব্যবহারে ভাগ্যরাজ ছিলেন অসাধারণ দক্ষ। তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ‘সুভার ইল্লাথা ছিথিরাঙ্গল’-এ সেই ভাষার ব্যবহার দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।

সংগীত নিয়েও ভাগ্যরাজ ঝুঁকি নিতে ভয় পাননি। ইলাইরাজার আধিপত্যের সময়েও ‘আন্ধা ৭ নাটকাল’ ছবিতে তিনি সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব দেন এম এস বিশ্বনাথানকে। ছবির সব গানই পরে দারুণ জনপ্রিয় হয়।

ব্যক্তিজীবন ও রাজনীতি
প্রথম স্ত্রী প্রবীণার মৃত্যুর পর ভাগ্যরাজ বিয়ে করেন অভিনেত্রী পূর্ণিমা ভাগ্যরাজকে। তাঁদের ছেলে শান্তনুও বর্তমানে তামিল চলচ্চিত্রের পরিচিত অভিনেতা।
চলচ্চিত্রের বাইরে রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। এম জি রামাচন্দ্রনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘এমজিআর মাক্কাল মুন্নেত্র কাঝাগম’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। পরে আরও দুটি রাজনীতিতে যোগ দেন, যদিও শেষের দিকে রাজনীতিতে আর সক্রিয় ছিলেন না।

দ্য হিন্দু অবলম্বনে