
বলিউডে এমন অনেক তারকার গল্প আছে, যাঁরা খ্যাতির শিখরে উঠেও হারিয়ে গেছেন। আবার কেউ কেউ আলোঝলমলে দুনিয়া ছেড়ে বেছে নিয়েছেন একেবারে ভিন্ন জীবন। অভিনেত্রী পেরিজাদ জোরাবিয়ানের গল্প সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। যে অভিনেত্রী একসময় অমিতাভ বচ্চন, ওম পুরি, শাবানা আজমি কিংবা ভিক্টর ব্যানার্জির মতো শিল্পীদের সঙ্গে অভিনয় করেছেন, তিনিই আজ পরিচিত একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। চলচ্চিত্রের ক্যামেরা, প্রিমিয়ার আর রেড কার্পেট থেকে দূরে সরে তিনি গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার পোলট্রি ব্যবসা।
বলিউডে তাঁর ক্যারিয়ার দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু ছিল স্মরণীয়। আর অভিনয় ছাড়ার পর তাঁর দ্বিতীয় জীবনের গল্পও কম নাটকীয় নয়।
৩৩ বছর বয়সে বিয়ে করেন পেরিজাদ। তাঁর স্বামীর নামও বোমান ইরানি, যদিও তিনি অভিনেতা বোমান ইরানি নন। বিয়ের আগে স্বামী তাঁকে বলেছিলেন, সংসারজীবনে তিনি চাইবেন না যে পেরিজাদ দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন শহর বা দেশে শুটিং করতে থাকুন। এটি কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না; বরং একটি ব্যক্তিগত পছন্দের কথা। পেরিজাদ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন।তখন পেরিজাদের বয়সও এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যখন তিনি পরিবার এবং মাতৃত্ব নিয়ে ভাবছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে তিনি সন্তান ও পরিবারকে বেশি সময় দিতে চান। ফলে অভিনয় থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নেন।
ছোটবেলা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন
মুম্বাইয়ের এক ইরানি পরিবারে জন্ম পেরিজাদের। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল ব্যবসায়ী হওয়ার। অনেক শিশু যখন অভিনেতা, ডাক্তার বা পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন পেরিজাদ নিজেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কল্পনা করতেন।
পরবর্তী সময়ে পেরিজাদ উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। নিউইয়র্ক থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। সেখানে পড়াশোনার সময় অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বন্ধুর সূত্রে তিনি ভর্তি হন বিখ্যাত লি স্ট্রাসবার্গ থিয়েটার অ্যান্ড ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। এক বছর অভিনয়ের প্রশিক্ষণও নেন।
তবে তখনো পেরিজাদের লক্ষ্য ছিল পারিবারিক ব্যবসা। দেশে ফিরে বাবার প্রতিষ্ঠিত ‘জোরাবিয়ানস চিকেনস’-এ কাজ শুরু করেন। মনে হয়েছিল, জীবনটা হয়তো ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু ভাগ্যের অন্য পরিকল্পনা ছিল।
একটি বিজ্ঞাপন বদলে দিল জীবন
এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পেরিজাদ। সেখানেই একজন মডেল সমন্বয়কারীর নজরে পড়েন তিনি। ফলাফল, জনপ্রিয় ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ব্র্যান্ডের একটি বিজ্ঞাপনে কাজের সুযোগ। সেই বিজ্ঞাপনই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সুন্দর পর্দা উপস্থিতি এবং আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব দ্রুতই নির্মাতাদের নজর কেড়ে নেয়।
এর কিছুদিনের মধ্যেই পরিচালক নাগেশ কুকুনুরের ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র ‘বলিউড কলিং’-এ প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ওম পুরি।
মজার বিষয় হলো, ছবিটির শুটিংয়ের জন্য পেরিজাদ বাবার অফিস থেকে মাত্র এক মাসের ছুটি নিয়েছিলেন। তখনো তিনি ভাবেননি যে অভিনয় তাঁর জীবনের বড় পরিচয় হয়ে উঠবে।
অন্য রকম একসময়ের তারকা
২০০০-এর দশকের শুরুতে ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটি নতুন ধারা তৈরি হচ্ছিল। মূলধারার হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার ভারতীয় সিনেমাও ধীরে ধীরে দর্শকের আগ্রহ পাচ্ছিল।
‘মনসুন ওয়েডিং’, ‘হায়দরাবাদ ব্লুজ’, ‘বলিউড কলিং’-এর মতো ছবিগুলো শহুরে শিক্ষিত দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করছিল। এই বিশেষ ধারার অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন পেরিজাদ।
পরপর ‘মর্নিং রাগা’, ‘জগার্স পার্ক’, ‘মুম্বাই ম্যাটিনি’র মতো ছবিতে অভিনয় করেন।অভিনয়ের প্রশংসাও পান।
তবে পেরিজাদ নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি কখনো মূলধারার বলিউড সুপারস্টার ছিলেন না। তাঁর ভাষায়, তিনি জানতেন যে তাঁকে নিয়ে যে ধরনের আলোচনা হয়, তা কারিশমা কাপুর বা সমসাময়িক বড় তারকাদের মতো নয়। কিন্তু তাতে তাঁর কোনো আফসোস ছিল না। কারণ, তিনি এমন এক ঘরানার ছবির মুখ হয়ে উঠেছিলেন, যার নিজস্ব দর্শক ছিল।
অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ
পেরিজাদের ক্যারিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ।
‘এক অজনবি’ ছবিতে পেরিজাদ অমিতাভের সহশিল্পী হন। এ ছাড়া টেলিভিশনেও কাজ করেছেন। মঞ্চনাটকেও ছিলেন সক্রিয়। ২০০৪ সালে একটি চীনা ছবিতে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটির জন্য তাঁকে তিন মাস চীনে থাকতে হয়েছিল।
অভিনয়ের জগতে পেরিজাদের সম্ভাবনা নিয়ে তখন অনেকেই আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই জীবনে আসে নতুন মোড়।
বিয়ে এবং কঠিন সিদ্ধান্ত
৩৩ বছর বয়সে বিয়ে করেন পেরিজাদ। তাঁর স্বামীর নামও বোমান ইরানি, যদিও তিনি অভিনেতা বোমান ইরানি নন। বিয়ের আগে স্বামী তাঁকে বলেছিলেন, সংসারজীবনে তিনি চাইবেন না যে পেরিজাদ দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন শহর বা দেশে শুটিং করতে থাকুন। এটি কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না; বরং একটি ব্যক্তিগত পছন্দের কথা। পেরিজাদ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন।
তখন পেরিজাদের বয়সও এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যখন তিনি পরিবার এবং মাতৃত্ব নিয়ে ভাবছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে তিনি সন্তান ও পরিবারকে বেশি সময় দিতে চান। ফলে অভিনয় থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নেন।
ফিরিয়ে দেন বড় বড় প্রস্তাব
অভিনয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও পেরিজাদের কাছে কাজের প্রস্তাব আসা বন্ধ হয়নি।
সুভাষ ঘাই তাঁকে ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ ছবির প্রস্তাব দেন। পরিচালক নিখিল আদভানি তাঁকে ‘সালাম-এ-ইশক’-এ অভিনয়ের অফার দেন।
অনেক অভিনেত্রীর জন্য এমন সুযোগ ছেড়ে দেওয়া কল্পনাতীত হতে পারে। কিন্তু পেরিজাদ নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
পেরিজাদ পরিবার গড়তে চেয়েছিলেন। সন্তানদের বড় হতে দেখতে চেয়েছিলেন কাছ থেকে। তাঁর মতে, সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে মানসিক শান্তি দিয়েছে।
দ্বিতীয় জীবনের শুরু
অভিনয় ছাড়ার পর অনেক তারকাই হারিয়ে যান। কিন্তু পেরিজাদের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা। তিনি পুরোপুরি মনোযোগ দেন পারিবারিক ব্যবসায়। যে সময় তিনি ব্যবসায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন, তখন প্রতিষ্ঠানটি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আর্থিক চাপও ছিল। কিন্তু ব্যবসায়িক শিক্ষা, পারিবারিক অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বের দক্ষতা দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
১২০ কোটির ব্যবসা
আজ ‘জোরাবিয়ানস’ শুধু একটি পোলট্রি কোম্পানি নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ খাদ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। হোলসেল ব্যবসা থেকে শুরু করে রিটেইল, রেডি-টু-কুক পণ্য এবং দ্রুত সরবরাহব্যবস্থার মতো আধুনিক ব্যবসায়িক মডেলেও প্রবেশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে কোম্পানিটির বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ১২০ কোটি রুপি।
প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেন প্রায় ৭০০ জন কর্মী। ভারতের পোলট্রিশিল্পে এটি একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। পেরিজাদের দাবি, তাঁরা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করেন না; বরং গুণগত মানসম্পন্ন বিশেষায়িত পণ্য নিয়ে কাজ করেন।
সাফল্যের অন্য মূল্য
ব্যবসায়িক সাফল্য এলেও জীবন যে একেবারে সহজ হয়ে গেছে, এমন নয়। পেরিজাদ স্বীকার করেছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘মম গিল্ট’ এবং ‘ওয়ার্ক গিল্ট’-এর মধ্যে বাস করেছেন।
একদিকে সন্তানদের জন্য সময় দেওয়ার তাগিদ, অন্যদিকে ব্যবসার দায়িত্ব—দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা সহজ ছিল না।
পেরিজাদ বলেছেন, নিজের জন্য আলাদা সময় বের করাও তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগও খুব কম পান। তবু তিনি জানেন, এটাই ছিল তাঁর স্বপ্নের জীবন।
আবার কি ফিরবেন অভিনয়ে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি ‘না’ নয়। পেরিজাদ জানিয়েছেন, অভিনয়ে ফেরার কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা তাঁর নেই। তবে যদি এমন কোনো চরিত্র বা গল্প আসে, যা তাঁর সময় ও মনোযোগের যথার্থ মূল্য দিতে পারে, তাহলে তিনি বিবেচনা করবেন। কারণ, এখন তাঁর জীবনে শুধু অভিনয় নয়, পরিবার এবং বিশাল ব্যবসায়িক দায়িত্বও রয়েছে।
আলো থেকে দূরে, কিন্তু সাফল্যের কেন্দ্রে
বলিউডের ইতিহাসে পেরিজাদ জোরাবিয়ানের নাম হয়তো সবচেয়ে বড় তারকাদের তালিকায় লেখা থাকবে না। কিন্তু তাঁর জীবনের গল্প নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
পেরিজাদ দেখিয়েছেন, সাফল্য শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পাওয়া যায় না। কখনো কখনো আলোঝলমলে মঞ্চ ছেড়ে অন্য পথে হাঁটাও সমান সাহসের কাজ।
অভিনেত্রী হিসেবে পেরিজাদ প্রশংসা পেয়েছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে অর্জন করেছেন আরও বড় সাফল্য। আর এই দুই পরিচয়ের মাঝখানে রয়েছে একজন নারীর সচেতন সিদ্ধান্ত, যিনি নিজের জীবনকে নিজের মতো করে সাজিয়েছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে