ধর্মীয় মেরুকরণ নিয়ে করা সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে যখন বলিউডে তুমুল আলোচনা চলছিল, ঠিক সেই সময়েই একেবারে ভিন্ন আবহে দর্শকের সামনে হাজির হলেন অস্কারজয়ী সুরকার এ আর রাহমান। নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় কমেডি অনুষ্ঠান ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কপিল শো’–এর বিশেষ পর্বে তাঁর উপস্থিতি একদিকে যেমন দর্শকদের মধ্যে স্বস্তির আবহ তৈরি করেছে, তেমনি নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কও উসকে দিয়েছে।
এই পর্বটি আয়োজন করা হয় আসন্ন চলচ্চিত্র ‘গান্ধী টকস’–এর প্রচার উপলক্ষে।
অনুষ্ঠানে রাহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী অদিতি রাও হায়দারি, অভিনেতা বিজয় সেতুপতি এবং কৌতুক অভিনেতা সিদ্ধার্থ যাদব। প্রোমো প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়—রাহমান কি সরাসরি বিতর্কের প্রসঙ্গে কথা বলবেন, নাকি বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন?
প্রোমোর শুরুতেই সঞ্চালক কপিল শর্মা রসিকতার ছলে প্রয়াত কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের একটি সিডিতে হাত রেখে রহমানকে শপথ করান। শর্ত ছিল—সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সরাসরি, এক লাইনে, কোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এই দৃশ্যটি ছিল কেবল হাস্যরসের জন্য নয়; বরং দর্শকের প্রত্যাশা তৈরি করতেই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
কিন্তু প্রশ্নোত্তর পর্বে দেখা যায়, রহমান তাঁর স্বভাবসুলভ সংযত ভঙ্গিতেই কথা বলছেন। ক্রিকেট দেখেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, তিনি ক্রিকেট দেখেন না। আবার নভোজিত সিং সিধুকে চেনেন কি না জানতে চাইলে সংক্ষেপে বলেন, তাঁকে ভালোভাবেই চেনেন। কোনো প্রশ্নেই তিনি বিতর্কের দিকে যাননি। বরং সচেতনভাবেই বিনোদনের সীমারেখার ভেতরে থাকতে চেয়েছেন।
এই সংযমই বিশ্লেষকদের চোখে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ, এর ঠিক আগেই বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রহমান বলেছিলেন, গত আট বছরে হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ কমে যাওয়ার পেছনে শিল্পের ক্ষমতার কেন্দ্র বদলে যাওয়ার বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার বিষয়ও থাকতে পারে, যদিও তা তিনি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেননি। এই বক্তব্য ঘিরেই শুরু হয় তর্ক–বিতর্ক।
অনেকেই তাঁর বক্তব্যকে বলিউডে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অভিযোগ হিসেবে দেখেছেন। আবার অনেকে বলেছেন, তিনি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোর কথাই তুলে ধরেছেন, যা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিতর্ক তীব্র হওয়ার পর রাহমান নিজেও ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, তাঁর উদ্দেশ্য কারও অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া নয়, ভুল ব্যাখা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই কপিল শো–এর পর্বে তাঁর বলা একটি কথা নতুন তাৎপর্য পায়। ‘হুইস্পার গেম’ বা কানে কানে কথা পৌঁছানোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বার্তা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে বদলে যায়। পৃথিবীর বড় সমস্যাই হলো—তথ্য চলার পথে বিকৃত হয়ে পড়ে। সরাসরি বিতর্কের কথা না বললেও, এই বক্তব্যে অনেকেই তাঁর আগের মন্তব্যের প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছেন।
অন্যদিকে, অনুষ্ঠানের বিনোদনমূলক অংশও দর্শকদের মধ্যে স্বস্তি এনে দেয়। কপিল শর্মা ও বিজয় সেতুপতির কথোপকথন, অদিতি রাও হায়দারির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে হালকা রসিকতা এবং সিদ্ধার্থ যাদব ও বিজয় সেতুপতির মূক অভিনয়—সব মিলিয়ে পর্বটি ছিল হালকা ও প্রাণবন্ত।
তবে এই উপস্থিতির পরও বিতর্ক থেমে যায়নি। বরং রাজনৈতিক পরিসর থেকে নতুন করে সমালোচনা এসেছে। মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী নীতেশ রানে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানের সমালোচনা করে বলেন, রাহমানের সাম্প্রতিক মন্তব্য ভারতীয় ও হিন্দুসমাজের ভাবাবেগে আঘাত করেছে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে এত বড় বিনোদনমূলক মঞ্চে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত হয়নি। একই সঙ্গে তিনি ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কনটেন্ট নীতিমালা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
সব মিলিয়ে কপিলের শোর এই পর্বটি হয়ে উঠেছে নিছক বিনোদনের চেয়েও বেশি কিছু। সমালোচকদের মতে, এটি দেখিয়েছে, কীভাবে একজন শিল্পীর একটি মন্তব্য বিনোদন, রাজনীতি ও সামাজিক আলোচনার মধ্যকার সূক্ষ্ম সীমারেখাগুলোকে স্পর্শ করে। উত্তপ্ত সময়ের মধ্যেও রাহমানের সংযত উপস্থিতি ও বক্তব্য অনেক দর্শকের কাছে স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে।