
বলিউডে যাঁরা খুব দ্রুত জনপ্রিয়তার শিখরে উঠেছিলেন, আবার একই গতিতে আলো থেকে খানিকটা দূরেও সরে গেছেন, তাঁদেরই একজন মিনিশা লাম্বা। একসময় তাঁকে ঘিরে ছিল ‘পরবর্তী বড় তারকা’ হওয়ার আলোচনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনের পথ বদলেছে, বদলেছে পরিচয়ও। অভিনয়ের বাইরেও যে জীবন আছে, সে জীবনকে বেছে নেওয়ার সাহসটাই মিনিশা লাম্বাকে আলাদা করে চিনিয়েছে। গতকাল ১৮ জানুয়ারি ছিল অভিনেত্রীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক তাঁর সম্পর্কে কিছু জানা–অজানা তথ্য।
দিল্লির মেয়ে, বলিউডের স্বপ্ন
১৮ জানুয়ারি ১৯৮৫, ভারতের দিল্লিতে জন্ম মিনিশা লাম্বার। বাবা পাঞ্জাবি ও মা গুজরাটি—এই সাংস্কৃতিক মিশ্রণ তাঁর ব্যক্তিত্বেও প্রভাব ফেলেছে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন মিনিশা। দিল্লির মিরান্ডা হাউস কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তখন তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল সাংবাদিকতা বা গবেষণার মতো পেশা। কিন্তু ভাগ্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
হঠাৎ বদলে যাওয়া জীবনের মোড়
কলেজে পড়ার সময় মিনিশার সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাস নজরে পড়ে বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের। হেয়ার অয়েল, গয়না ও পোশাকের বিজ্ঞাপনে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। বিজ্ঞাপনের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েই প্রথম বুঝতে পারেন, এই আলো ও লেন্স তাঁর অচেনা নয়।
২০০৫ সালে মুক্তি পায় মিনিশার প্রথম সিনেমা ‘ইয়াহান’। কাশ্মীরের পটভূমিতে তৈরি এই প্রেম ও রাজনীতির গল্পে শহীদ কাপুরের বিপরীতে মিনিশার অভিনয় প্রশংসিত হয়। বলিউডে তখন নতুন মুখের ভিড়, কিন্তু মিনিশা আলাদাভাবে নজর কাড়েন তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় ও সংযত অভিব্যক্তির জন্য।
সাফল্যের স্বাদ, জনপ্রিয়তার চাপ
এরপর একের পর এক ছবিতে দেখা যায় মিনিশাকে। এগুলোর মধ্যে আছে ‘হানিমুন ট্রাভেলস প্রাইভেট লিমিটেড’, ‘বাচ্চা আয়ে হাসিনো’, ‘কিডন্যাপ’, ‘ভেজা ফ্রাই ২’ ইত্যাদি।
বিশেষ করে ২০০৭ সালের ‘হানিমুন ট্রাভেলস প্রাইভেট লিমিটেড’ ছবিতে তাঁর কমিক টাইমিং দর্শকদের পছন্দ হয়। আর ‘বাচ্চা আয়ে হাসিনো’–তে দীপিকা পাড়ুকোন ও বিপাশা বসুর মতো অভিনেত্রীদের ভিড়ে থেকেও তিনি আলাদাভাবে চোখে পড়েছিলেন।
কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে আসে চাপ। মিনিশা পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেন, বলিউডে নায়িকাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ছাঁচ তৈরি করা থাকে, সেই ছাঁচে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারলে ধীরে ধীরে কাজ কমে আসে।
আলো থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত
২০১০ সালের পর থেকে বড় ব্যানারের ছবিতে মিনিশার উপস্থিতি কমতে থাকে। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো তিনি হারিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অন্য রকম।
২০১৪ সালে মিনিশা অংশ নেন জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘বিগ বস সিজন ৮’–এ। এই শোয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্য একটি দিক দর্শকের সামনে আসে—সংযত, স্পষ্টভাষী, কিন্তু অযথা নাটক না করা একজন মানুষ। তবে বিতর্ক ও গসিপে আগ্রহী না হওয়ায় শোতেও তিনি খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারেননি।
ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন
২০১৫ সালে ব্যবসায়ী রায়ান থামকে বিয়ে করেন মিনিশা। বিয়ের পর কিছুদিন অভিনয় থেকে পুরোপুরি দূরে ছিলেন তিনি। কিন্তু এই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২০ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে।
এই বিচ্ছেদ নিয়ে খুব বেশি প্রকাশ্যে কথা বলতে দেখা যায়নি মিনিশাকে; বরং তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘জীবনের কিছু অধ্যায় চুপচাপ শেষ করাই ভালো।’
এই সংযমই মিনিশাকে বলিউডের চেনা গুঞ্জন–সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে রেখেছে।
অভিনয়ের বাইরে নতুন পরিচয়
অনেকেই জানেন না অভিনয়ের পাশাপাশি মিনিশা একজন সফল ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা। বিয়ের পর থেকেই তিনি এই পেশার দিকে মন দেন। নিজের ডিজাইন ফার্ম চালু করেন, যেখানে ঘর সাজানোর নান্দনিক ধারণা বাস্তবে রূপ দেন।
মিনিশার ভাষায়, ‘অভিনয় আমার ভালোবাসা, কিন্তু ডিজাইন আমাকে শান্তি দেয়।’
এটাই হয়তো মিনিশার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—খ্যাতির পেছনে না ছুটে নিজের পছন্দের জগৎ তৈরি করা।
বলিউডে ফেরার সম্ভাবনা?
মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন ওঠে, মিনিশা লাম্বা কি আবার বড় পর্দায় ফিরবেন? এ বিষয়ে তিনি কখনোই সরাসরি ‘না’ বলেননি; বরং বলেন, ‘ভালো চরিত্র, ভালো গল্প পেলে অবশ্যই।’
তবে আগের মতো নিয়মিত কাজের দৌড়ে মিনিশা নেই। বদলে গেছেন তিনি নিজেই। আর সেই বদলকে গ্রহণ করতেও শিখেছেন।
হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে