‘রকস্টার’–এ শাকিব খানের সঙ্গে দেখা গেছে তানজিয়া মিথিলা ও সাবিলা নূরকে। কোলাজ
‘রকস্টার’–এ শাকিব খানের সঙ্গে দেখা গেছে তানজিয়া মিথিলা ও সাবিলা নূরকে। কোলাজ

মেশিনগান ছেড়ে গিটার হাতে শাকিব, কেমন হলো ‘রকস্টার’

নিজেকে ভাঙাগড়ার খেলায় মেতেছেন শাকিব খান। প্রতি ঈদে তিনি যেমন নতুন পরিচালকদের সুযোগ করে দিচ্ছেন, তেমনি নিজেকে নিয়েও করছেন দেদার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। শাকিব খান নিজেকে ভাঙছেন ঠিকই, কিন্তু পরিচালকেরা কি তাঁকে সেভাবে কাজে লাগাতে পারছেন? কথা হচ্ছিল ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া আজমান রুশোর সিনেমা ‘রকস্টার’ নিয়ে। টিজার, পোস্টার আর গান দিয়ে মুক্তির আগে যেভাবে সিনেমাটি নিয়ে আগ্রহ জাগিয়েছিলেন নতুন পরিচালক, সিনেমা হলে গিয়ে সেসবের প্রতিফলন কতটা দেখতে পেলেন দর্শক?

একনজরেসিনেমা: ‘রকস্টার’ধরন: রোমান্টিক ড্রামাচিত্রনাট্য: নুসরাত মাটিসংলাপ: আয়মান আসিব স্বাধীন ও সামিউল ভুঁইয়াপরিচালনা: আজমান রুশোঅভিনয়: শাকিব খান, সাবিলা নূর, তানজিয়া মিথিলা, সুনিধি নায়েক, তারিক আনাম খান, রোজী সিদ্দিকী ও কাজী সাবিরদৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২৭ মিনিট

শাকিব খানকে নতুনরূপে দেখে অনেক দর্শক আনন্দ পেয়েছেন, সে কথা বলাই বাহুল্য। আগের সিনেমাগুলোতে (‘তুফান’, ‘বরবাদ’, ‘তাণ্ডব’, ‘প্রিন্স’) শাকিব খানকে দেখা গিয়েছিল অ্যাকশনের মেজাজে। প্রায় সব ছবিতে ছিলেন মেশিনগান হাতে। তবে ‘রকস্টার’ সিনেমায় তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন গিটার আর মাইক। সিনেমার একপর্যায়ে আগুন (শাকিব খান) বলেন, ‘এবার আমি মেশিনগান ছেড়ে গিটার হাতে নিলাম।’ এটা যেন নিজেকে নিয়ে নিজেরই করা দারুণ এক মজা, যেমনটা ‘উৎসব’-এ করেছিলেন জয়া আহসান।

সিনেমার নাম শুনেই বোঝা যায় এটি একটি মিউজিক্যাল সিনেমা। যেখানে গানকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে সিনেমার গল্প। গল্পের শুরু স্টেডিয়ামভর্তি দর্শকদের ‘আগুন, আগুন’ চিৎকারে। এরপর গ্রিনরুমে বসে থাকা নতুন এক শাকিব খানকে দেখে নড়েচড়ে বসেন দর্শক। নতুন এক শাকিব খানের সঙ্গে পরিচিত হন দর্শক।

এরপর অতীতে ফিরে যায় গল্প। আগুন এক সংগীত পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা ওস্তাদ জুনায়েদ (তারিক আনাম খান), বিখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ। তবে শুরুতেই বোঝা যায়, বাবার ছায়া থেকে বের হয়ে নতুন কিছু করতে চায় আগুন। তাই সে বেছে নিয়েছে রক গানের ধারা। একা একা দাদির (দিলারা জামান) কাছে বড় হয় ছোট্ট আগুন। ভেঙে যাওয়া পরিবারে বড় হওয়ার দুর্বিষহ যন্ত্রণা যেন আগুনকে সব সময় দগ্ধ করে।

আগুন একটি ব্যান্ডের সদস্য। ব্যান্ডের সব গান সে নিজেই লেখে। তবে মাইক হাতে তাকে কখনো দেখা যায় না। কারণ, শৈশবের মঞ্চভীতি। একদিন ব্যান্ডের লিড ভোকালের অনুপস্থিতে মঞ্চে ওঠেন আগুন। আর সেদিনই মাত করে ফেলেন তিনি।
কনসার্টের মধ্যেই একটি মেয়ে আগুনের নজর কাড়ে। গান শেষে হয় মীরা (সাবিলা নূর) নামের সেই মেয়েটির সঙ্গে আগুনের পরিচয়। দ্রুতই ভালোবাসায় রূপ নেয় পরিচয়। প্রথম গানে ভাইরাল হয়ে ওঠা আগুনের সামনে একের পর এক আসতে থাকে বড় প্রযোজনা সংস্থার প্রস্তাব। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠে আগুন। আর বিখ্যাত হওয়াই যেন অভিশাপ হয়ে ওঠে আগুনের জন্য। নেশার কবলে পড়ে সে হিতাহিতজ্ঞান হারায়। আগুন কি পারে সব ঠিক করে উঠে দাঁড়াতে? নাকি নেশার চোরাবালিতে হারিয়ে যায়?

‘রকস্টার’–এ সাবিলা ও শাকিব। ভিডিও থেকে

‘রকস্টার’ যতটা না মিউজিক্যাল, তার চেয়ে বেশি রোমান্টিক ড্রামা। সংগীতশিল্পীর জীবনে আসা প্রেম, বিচ্ছেদ আর তার পরিণতি নিয়ে দুনিয়ার নানা প্রান্তে বহু সিনেমা হয়েছে। ‘রকস্টার’ও সে ধারা মেনেই এগিয়েছে। এই সিনেমা আপনাকে দুভাবে চমকে দেবে—ভিজ্যুয়াল আর শাকিব খান।

‘রকস্টার’ সিনেমাতে এক সংগীতশিল্পীর ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং যথাযথ ছিল। ব্যান্ডের প্র্যাকটিস প্যাড, খুনসুটি, বিদেশে বিশাল কনসার্ট—সবই বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। এ জন্য চিত্রগ্রাহক আবদুল মামুনের ধন্যবাদ প্রাপ্য। এআইয়ের ব্যবহারও ছিল ভালো। আগুন গান লেখে। তাঁর ঘরের দেয়ালজুড়ে বব মার্লে, ওয়েসিসের পোস্টার; যা দিয়ে অগ্রজ কিংবদন্তি শিল্পী আর ব্যান্ডকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়েছেন নির্মাতা। সিনেমার সেরা রোমান্টিক মুহূর্তগুলোর একটি ছিল সুউচ্চ ভবনের ছাদে বসে আগুন আর মীরা কথা বলা।

‘রকস্টার’ সিনেমার শুটিংয়ে শাকিব খানের সঙ্গে তানজিয়া জামান মিথিলা

এই সিনেমায় কোনো অ্যাকশন নেই, এটাই ছিল শাকিব খানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শৈশবের যন্ত্রণা, ভুল সঙ্গ আর প্রেমিকার ছেড়ে যাওয়ায় আগুন নেশা করতে শুরু করে। ‘বরবাদ’-এ এ ধরনের চরিত্র তিনি করেছেন। তাই মূল চ্যালেঞ্জ ছিল গায়ক হিসেবে আর রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তাঁর অভিব্যক্তি। দুই ক্ষেত্রে ভালো করেছেন তিনি। বিশেষ করে অসহায়ত্ব আর ভেঙে পড়ার দৃশ্যগুলো দেখে শাকিবকে নতুন করে আবিষ্কার করবেন দর্শক।

মীরা চরিত্রে সাবিলাও যথাযথ। গত বছর ‘তাণ্ডব’, ঈদুল ফিতরে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর পর এবার ‘রকস্টার’—টানা তিন ঈদের সিনেমায় অভিনেত্রীকে দেখা গেল। ভিন্ন তিন চরিত্রে উতরে গিয়ে নিজের অভিনয়–দক্ষতারই জানান দিয়েছেন সাবিলা। বিশেষ করে শাকিবের সঙ্গে রোমান্টিক দৃশ্যগুলো আর ‘আমি যাব হারিয়ে’ গানে তাঁদের রসায়নও ছিল ভালো। এ গান ছাড়াও সিনেমার আরও কয়েকটি রোমান্টিক মুহূর্তে স্লো মোশনের ব্যবহার ছিল যথার্থ।

তানজিয়া মিথিলা নিজের গ্ল্যামারাস উপস্থিতি দিয়ে অল্প সময়েও মন্দ করেননি। সুনিধি নায়েকের উপস্থিতিও ছিল খুবই অল্প। তারিক আনাম খান আর রোজী সিদ্দিকীর চরিত্র খুবই ছোট, তাঁদের খুব বেশি কিছু করার ছিল না। আগুনের বন্ধু আসলাম চরিত্রে কাজী সাবিরও মন্দ করেননি। সিনেমাজুড়েই দুই বন্ধুর ভালোবাসা, ঝগড়া, খুনসুটিতে মজা পেয়েছেন দর্শক। একপর্যায়ে আসলামকে দেখে ‘কানকাটা আসলাম’-এর কথা মনে পড়ে। কেন? সেটা বলে দিলে তো আর মজা থাকল না।

এবার আসা যাক গানের প্রসঙ্গে। ‘রকস্টার’-এ গান রয়েছে ১০টি। বেশির ভাগ গানের কথা লিখেছেন ও সুর করেছেন আহমেদ হাসান সানি। গানগুলোতে কণ্ঠও দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আছে রাজীব হাসান, হাসান রোবায়েত ও অংকনের লেখা গান। সংগীত পরিচালনায় আছেন জাহিদ নিরব। এর মধ্যে মুক্তি পাওয়া ‘পিরিতি’, ‘আমাকে উড়িয়ে দাও’, ‘আমি যাব হারিয়ে’ আর ‘বেশ কিছুদিন’ মুক্তি পেয়েছে। চারটি চার ধরনের গান। কোনোটি আধ্যাত্মিক, কোনোটিতে দেখা গেছে এক সংগ্রামী শিল্পীর গল্প, কোনোটি আবার পুরোপুরি রোমান্টিক, আবার কোনোটিতে ফুটে উঠেছে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা।

‘রকস্টার’–এর পোস্টারে শাকিব খান ও সাবিলা নূর। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

তবে সিনেমাটিতে সংগীতশিল্পী হিসেবে আগুনের উত্থান আর পতন পুরোপুরি বিকশিত হয়নি; বরং বারবার তাঁর প্রেমের সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। একের পর এক গান বেজে গেছে ঠিকই, কিন্তু সব কটির সঙ্গে একাত্ম হওয়া মুশকিল। শুধু গান নয়, গল্প কিংবা নায়ক-নায়িকার পরিবার, তাদের সম্পর্কের রসায়নের সঙ্গে সব সময় জুড়ে যাওয়া কঠিন ছিল। সিনেমায় বেশ কিছু চরিত্র ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এলেও তাদের সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিক কী, তা বোঝা যাচ্ছিল না। কখনো আবার অতি আবহসংগীতের জন্য সংলাপ বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। কিছু দৃশ্য অতি দীর্ঘ, সম্পাদক আনিস মাসুদের আরও ভালোভাবে দৃশ্যগুলো উপস্থাপন করার সুযোগ ছিল।

প্রথমার্ধে নির্মাতা একের পর এক ঘটনা দেখিয়ে গেলেও সিনেমার প্রধান চরিত্র আগুন কীভাবে এতটা জনপ্রিয়তা পেলেন, সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে দ্বিতীয়ার্ধে গল্প এগিয়েছে বেশ সাবলীল। অতীতের ঘটনাগুলো ভালোভাবে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। তবে এখানেও পরিচালক, সম্পাদক—দুজনেরই আরও ভালো করার সুযোগ ছিল।
তবে প্রথম সিনেমাতেই ভিন্নধর্মী গল্প বেছে নিয়েছেন আজমান রুশো, চেয়েছেন নতুন এক শাকিব খানকে হাজির করতে। তাঁর সেই ইচ্ছাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

‘রকস্টার’ সিনেমার শুটিংয়ে শাকিব খান