‘আপনি নিশ্চিত এই সিনেমা দেখবেন?’ রাজধানীর এক মাল্টিপ্লেক্সের টিকিট বিক্রেতার প্রশ্ন শুনে বিব্রতই হতে হলো। গিয়েছিলাম মুক্তি পাওয়া এক বাংলা সিনেমা দেখতে। মুক্তির তৃতীয় দিন দুপুরবেলা নিরুত্তাপ টিকিট কাউন্টার। এ রকম প্রশ্নের উদ্দেশ্য বুঝে ওঠার আগে রহস্য খোলাসা করলেন প্রশ্নকর্তা নিজেই।
শো শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি, এই প্রতিবেদকই নাকি প্রথম দর্শক হিসেবে টিকিটের ফরমাশ করেছেন! বিক্রেতা তাই নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছেন আসলেই দেখব কি না! বিকল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে ঝড় তোলা এক হলিউড সিনেমা দেখার পরামর্শ দিতেও ভুললেন না। আমি নাছোড়বান্দা, টিকিট দিলেন; মোটে চারজন দর্শক শেষ করলাম সিনেমা। রিভিউ লেখার দায় না থাকলে শেষ পর্যন্ত দেখতাম কি না বলা মুশকিল।
ঈদে আসা গোটা পাঁচেক সিনেমা আর মাঝের কয়েকটি বাদ দিলে এটাই ঢাকাই ছবির ২০২৫-এর সালতামামি। গোটা পঞ্চাশেক যা ছবি এসেছে, সেগুলোর মধ্যে মনে রাখার মতো সিনেমার চেয়ে ভুলে যাওয়া সিনেমার সংখ্যাই বেশি। তবে এই মন্দার মধ্যেও উজ্জ্বল ব্যতিক্রম একটি সিনেমা, যা হয়তো নতুন বছরে প্রযোজক ও নির্মাতাদের নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাতে পারে।
গত ৭ জুন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মুক্তি পেয়েছিল তানিম নূরের ‘উৎসব’। মুক্তির আগে সিনেমাটি নিয়ে বিশেষ আলোচনা ছিল না। ছবিতে একঝাঁক তারকা আছেন বটে, কিন্তু কেউই সেই অর্থে বড় পর্দার মহাতারকা নন, এই ছবি কি আর চলবে? কিন্তু মুক্তির পর দ্রুতই পাল্টে যায় হিসাব–নিকাশ; মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে উৎসব-বার্তা।
চার্লস ডিকেন্সের বহুল আলোচিত ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’ গল্পটি ঢাকার মোহাম্মদপুরের পটভূমিতে ফেঁদেছেন নির্মাতা। নব্বইয়ের নস্টালজিয়া, টিভির একঝাঁক চেনা মুখের বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় আর জমাটি চিত্রনাট্য ও সংলাপ মিলিয়ে দর্শকের আপন হয়ে ওঠে সিনেমাটি। সেটা এতটাই যে মুক্তির ২০০ দিনের বেশি সময় পর ঢাকার এক মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমাটি এখনো চলছে! সিনেমা হিসেবে উৎসব-এ অনেক খামতি ছিল অবশ্যই, কিন্তু ঈদের মতো উৎসবে যখন মুক্তি পাওয়া বেশির ভাগ বড় সিনেমাই হয় সহিংস অ্যাকশন–নির্ভর, সেখানে নতুন বার্তা দিয়েছে সিনেমাটি। দিয়েছে দেশি সিনেমার জন্য নতুন এক পথের সন্ধানও।
খুবই অল্প বাজেটে উৎসব সিনেমাটি বানিয়েছিলেন তানিম নূর। কিন্তু টিকিট বিক্রি সম্ভবত তাঁর প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে চলতি বছর সিনেমার ব্যবসা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, উৎসব-এর এই সাফল্য কাকতালীয় কিছু নয়। ২০২৫ সালে হলিউড বা বলিউড—সর্বত্রই অল্প বা মাঝারি বাজেটে নির্মিত সিনেমাগুলোই ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছে। সুপারহিরো আর বড় বাজেটের সিনেমা ফ্লপ হওয়ার পর অল্প বাজেটের হরর বা ড্রামা সিনেমাতেই আস্থা রাখছেন সারা দুনিয়ার প্রযোজকেরা।
‘উৎসব’-এর সাফল্য প্রমাণ করেছে, গল্প যদি দর্শককে, বিশেষ করে পরিবারকেন্দ্রিক দর্শককে আকৃষ্ট করতে পারে, তবে সেটা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়বে, অবধারিতভাবেই আসবে সাফল্য। একই ব্যাপার ঘটেছে এম রাহিমের ‘জংলি’ সিনেমার ক্ষেত্রেও। সিনেমা হিসেবে অনেক দুর্বলতা আছে, কিন্তু পারিবারিক দর্শকের আগ্রহের কারণেই এটি সাড়া ফেলে।
কয়েক বছর ধরে বছরে দুই কি তিনটি করে সিনেমা করেছেন শাকিব খান। ঢাকাই সিনেমার এই অন্যতম বড় তরকার সিনেমা মানেই হিট। এমন নায়ক—যিনি কিনা প্রায় নিশ্চিত হিট দিতে পারেন—যেকোনো ইন্ডাস্ট্রির সম্পদ। কিন্তু তিনি তো বছরে দুটি বা বড়জোর তিনটি সিনেমা করবেন, বাকি সময় কী হবে? বড় তারকার সিনেমায় তাঁর ভক্ত-দর্শককে সন্তুষ্ট করার ব্যাপার থাকে। সেখানে সিনেমার শিল্পমানের চেয়ে বাণিজ্যিক মসলা মেশানো হয় দর্শকচাহিদা মেনেই। গত কয়েক বছর মুক্তি পাওয়া অনেক সিনেমাতেই দেখা গেছে, সহিংস অ্যাকশন, যা পরিবার নিয়ে আসা অনেক দর্শক অস্বস্তিতে পড়েছেন। বড় বাজেট, বড় তারকা নিয়ে সিনেমা অবশ্যই হবে। কিন্তু বছরের অন্য সময়ে, অন্য দর্শকের কথা ভেবে দরকার অল্প বাজেটে নির্মিত বুদ্ধিদীপ্ত সিনেমা।
কম বাজেটে, অচেনা অভিনেতাদের নিয়েও যে ভালো সিনেমা করা যায়, তার আরেকটি প্রমাণ মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের দেলুপি। স্বাধীন ধারার এই নির্মাতা কেবল সিনেমাই বানাননি, কৌশলী প্রচারণা করে জনমানুষকেও ছবির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তানিম নূর ‘উৎসব’-এর সাফল্যের পর ২০২৬ সালের ঈদে বনলতা এক্সপ্রেস নিয়ে হাজির হবেন, হওয়ার পর বিরতি নেওয়া মেজবাউর রহমান সুমন আসবেন রইদ নিয়ে। মুক্তির অপেক্ষায় আছে শাকিব খানের তিনটি সিনেমা, রায়হান রাফিরও অন্তত দুটি সিনেমা আসার কথা।
গত বছর উৎসব এসেছিল চমক নিয়ে। অল্প বাজেটে বুদ্ধিদীপ্তভাবে গল্প বলে দর্শককে হলে টেনেছিলেন তানিম নূর। সেই সাফল্য থেকে
শিক্ষা নিয়ে নতুন বছরে কে চমকে দেন, সেটাই দেখার অপেক্ষা।