মোস্তফা কামাল রাজ। নির্মাতার সৌজন্যে
মোস্তফা কামাল রাজ। নির্মাতার সৌজন্যে

আমার হিংসা থাকলেও সেটা পজিটিভ

‘এটা আমাদেরই গল্প’র সর্বশেষ প্রচারিত পর্বের (২৬তম) ভিউ কোটির কাছাকাছি। ধারাবাহিক নাটকের কোনো পর্বের জন্য অপেক্ষা করছেন লাখো দর্শক, সাম্প্রতিক বাংলা নাটকে এই চিত্র নতুন। সিনেমা, নাটক ও ইন্ডাস্ট্রির নানা প্রসঙ্গে প্রথম আলোর মুখোমুখি হলেন নাটকটির পরিচালক মোস্তফা কামাল রাজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুরুল আলম

প্রশ্ন

নাটকটির নির্মাণ ভাবনা এল কীভাবে?

মোস্তফা কামাল রাজ : দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকের গল্প ভাবছিলাম। একসময় আমার টিম, আমার নিজস্ব কিছু লোক, কয়েকটি নাটকের লিংক দেয়। তার একটি ছিল পাকিস্তানের নাটক ‘কাভি মে কাভি তুম’। গল্পটি দেখে মনে হলো, অনেকটা একই রকম বার্তা নিয়ে আমিও একটা একক নাটক বানিয়েছিলাম। সেই নাটকের নাম ছিল ‘পিতামাতা সন্তান’। পরে মনে হলো পাকিস্তানের গল্প থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করলে দর্শক পছন্দ করবে।

মোস্তফা কামাল রাজ। নির্মাতার সৌজন্যে
প্রশ্ন

নাটকের প্রতি পর্বের বাজেট কত?

মোস্তফা কামাল রাজ : প্রতি পর্বে ৬–৭ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এই টাকা দিয়ে অনেকে ১০ পর্বের নাটক বানাতে পারবে।

প্রশ্ন

লগ্নি ফেরানো নিয়ে চিন্তা হয়নি?

মোস্তফা কামাল রাজ : লাভের চিন্তা করিনি। প্রচার–প্রচারণা দিয়ে শুধু লগ্নি ফিরে পেতে চেয়েছি। এখন এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভিউ দিচ্ছে। দর্শক প্রশংসা করছে। লাখো দর্শক পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করবে, এটা প্রত্যাশার বাইরে ছিল। তবে অন্য বিষয় নিয়ে চিন্তিত ছিলাম, সেখানেও এখন আমি সফল।

প্রশ্ন

কী নিয়ে চিন্তিত ছিলেন?

মোস্তফা কামাল রাজ : এক বছর ধরে নাটকটি নিয়ে পরিকল্পনা করতে হয়েছে। এ সময়ে বুঝতে পারি ধারাবাহিক নাটক নিয়ে দর্শক, প্রযোজক, তারকাদের অনীহা তৈরি হয়েছে। তখন খুব বেশি আলোচিত ধারাবাহিক ছিল না। যে কারণে স্পনসরদের ট্রাস্ট ছিল না। আমি ট্রাস্টের জায়গা তৈরি করতে চেয়েছিলাম। এখন শুনছি, অনেকেই ধারাবাহিক নির্মাণে মনোযোগ দিচ্ছে। স্পনসর নিয়েও অনেকে এগিয়ে আসছে। আমার সব সময় চাওয়া ছিল ইন্ডাস্ট্রি বড় হোক, হয়তো সেদিকেই এগিয়ে চলেছি আমরা।

মোস্তফা কামাল রাজ। নির্মাতার সৌজন্যে
প্রশ্ন

ছিলেন পরিচালক, প্রযোজনায় কেন যুক্ত হলেন?

মোস্তফা কামাল রাজ : এখনো প্রযোজকেরা গল্প বদলাতে চাপ দেন, আর্টিস্ট কে হবে বলে দেন। গল্পে যাকে দরকার, তাকেই বাদ দিতে বলেন। তাদের পছন্দমতো শিল্পী নিয়ে কাজ করতে হয়। অন্যের প্রযোজনায় কাজ করতে হলে হয়তো শুরুতেই সাজ্জাদ, বাসারদের বাদ দিতে হতো। অন্যের প্রযোজনায় নানা কৈফিয়ত দিতে হয়। আমি কাউকে কৈফিয়ত দিতে চাই না। সৃজনশীল কাজে কখনোই ছাড় দিইনি। যে কারণে আমি গল্পে মা–বাবা, ভাই–বোন, চাচা–ফুফু–খালা সবাইকেই দেখাতে পারছি। যা বাজেট লাগছে, তা–ই দিতে পারছি। আমার নিজস্ব সিনেমাওয়ালা ইউটিউবের সাবস্ক্রাইবার ৫৭ লাখের মতো। সেখানেই সব নাটক প্রচার হচ্ছে। সবাইকে নির্মাণের স্বাধীনতা দিতেই প্রযোজক হওয়া।

প্রশ্ন

‘ওমর’ আপনার সর্বশেষ সিনেমা। নিয়মিত সিনেমা নির্মাণ নিয়ে পরিকল্পনা কী?

মোস্তফা কামাল রাজ : নাটকই আমার রুটিরুজির জায়গা। এখান থেকেই আমার সব খরচ নির্বাহ করতে হয়, অফিস চালাতে হয়। এখান থেকে টাকা নিয়েই সিনেমা বানাই। এখন পর্যন্ত সিনেমা থেকে আমার তেমন আয় হয়নি। প্রত্যাশাও করি না। দুই–তিন বছর পর পর ভালো গল্প পেলেই সিনেমা বানাব।

মোস্তফা কামাল রাজ। নির্মাতার সৌজন্যে
প্রশ্ন

সিনেমা বানিয়েও তো অনেকে আয় করছে...

মোস্তফা কামাল রাজ : অনেকেই ভালো করছে। সেই সংখ্যা কম। আমার ক্ষেত্রে কেন জানি এটা হয়নি। নাটক থেকেই আমি সিনেমার চেয়ে বেশি টাকা আয় করি। নাটকের আয় থেকেই আমি সিনেমা বানাই।

প্রশ্ন

আপনাকে একই ধরনের শিল্পীদের নিয়েই বেশি কাজ করতে দেখা যায়, অনেকেই এটাকে সিন্ডিকেট বলছে, আপনি কী বলবেন?

মোস্তফা কামাল রাজ : এটা ভুল ধারণা। যাদের যোগ্যতা নেই, তারা বলে ইন্ডাস্ট্রিতে সিন্ডিকেট আছে। ২০২৬ সালে যোগ্যতা থাকলে কাউকে আটকানো যাবে না। এখন ফেসবুক, ইউটিউব ওপেন মাধ্যম। যে কেউ সেখানে প্রতিভা দেখানোর সুযোগ রাখে। এসব প্ল্যাটফর্ম থেকেই অনেকে অভিনয়ে আসছে। শুধু সিন্ডিকেটের কথা বলে লাভ নেই, প্রমাণ দেখাতে হবে। দু–একজন আমার সঙ্গে কাজ করে নিয়মিত, সেটার ব্যাখ্যা আমার কাছে আছে।

প্রশ্ন

এখন বেশির ভাগ সময় জোভানকে দেখা যায়...

মোস্তফা কামাল রাজ : আমি এখন সবচেয়ে বেশি জোভানকে নিয়ে কাজ করছি। একটা কাজের জন্য জোভান যে পরিমাণ সময় দেয়, শ্রম দেয়, অনেকেই সেটা দিতে পারে না। আমাদের বোঝাপড়া ভালো। এখন গল্প ভাবলেই জোভানের কথা মনে হয়। এ ছাড়া আমার তো কমফোর্ট জোন থাকতে হবে। আবার অনেকেই বলে মনিরা মিঠু আপার কথা। এ সময়ে মায়ের চরিত্রে দক্ষ তেমন আর কে ভালো হতে পারেন? আমি যা চাই, সেটা মনিরা মিঠু আপার মধ্যে পাই বলেই তো কাস্ট করি। প্রায় আট বছর পর ইরফান সাজ্জাদের সঙ্গে, তিন বছর পর খায়রুল বাসারের সঙ্গে আমার কাজ হচ্ছে। গল্পে যাকে দরকার, তাকে নিয়েই আমি কাজ করি। সিন্ডিকেটের দোহাই দিয়ে লাভ নেই।

মোস্তফা কামাল রাজ। নির্মাতার সৌজন্যে
প্রশ্ন

১৮ বছরের ক্যারিয়ার। তরুণ নির্মাতাদের কখনো প্রতিযোগী হিসেবে দেখেন?

মোস্তফা কামাল রাজ : নির্মাতার জায়গা থেকে ভালো কাজ করে এক নম্বরে থাকতে চাই। আমার হিংসা থাকলেও সেটা পজিটিভ। আমি ওপরে উঠব, কিন্তু তাই বলে আরেকজনকে নিচে নামাব—এই চিন্তা কখনোই করি না। আমি পাঁচজনের মধ্য থাকলেও আপত্তি নেই। তরুণেরা যারা ভালো কাজ করছে, তাদের প্রশংসা করি। অন্যরা ভালো করুক, সেটা চাই। পাঁচজন ভালো কাজ করলেই ইন্ডাস্ট্রি এগিয়ে যাবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে চলেছি।

প্রশ্ন

জনপ্রিয়তা বাড়লে পর্ব বাড়ে, আপনি কত পর্বে ‘এটা আমাদেরই গল্প’ শেষ করতে চান?

মোস্তফা কামাল রাজ : যতই জনপ্রিয়তা বাড়ুক, আমরা নাটকের পর্ব বাড়াব না। ৫২ পর্বেই শেষ হবে।