
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমায় ভিন্নভাবে নজর কেড়েছেন নুহাশ হুমায়ূন। এ মাস থেকেই হলিউডের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় শুরু করতে যাচ্ছেন ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমা মুভিং বাংলাদেশ-এর কাজ। এসব নিয়েই প্রথম আলোর মুখোমুখি হলেন তরুণ পরিচালক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুরুল আলম
ঈদ কই করলেন?
নুহাশ হুমায়ূন: ঈদ তো সব সময় দেশেই করা হতো। কিন্তু বেশ কয় বছর ধরে পরিবারের সদস্যরা দেশ-বিদেশ ছড়িয়ে গিয়েছে। আমার বোনেরা কেউ বাইরে থাকেন। যে কারণে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ করতে হয়েছে। এবার সিনেমা নিয়ে খুবই ব্যস্ত। যে কারণে দেশেই করা হয়েছে।
ফেসবুকে দেখলাম, অভিনয়শিল্পী খুঁজছেন। পেয়েছেন?
নুহাশ হুমায়ূন: অডিশন নিয়েছি। অনেকের সঙ্গেই কথা হয়েছে। কাজ চলছে। আমরা আশাবাদী।
প্রথম সিনেমা। অভিজ্ঞতা কেমন?
নুহাশ হুমায়ূন: আসলে একটা সিনেমার জন্য কিন্তু অনেক সময় লাগে। আমার সিনেমায় আন্তর্জাতিক প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠান যুক্ত আছে। আমাদের ফান্ড সংগ্রহ করতে হয়েছে, অনেক ল্যাবে গিয়েছি। বেশ কিছু জায়গা থেকে ইনভেস্ট (লগ্নি) পেয়েছি। আমি তো ফিল্ম স্কুলে পড়িনি। যে কারণে এই প্রোগ্রামগুলো অনেক সহায়তা করেছে। আর ঈদের জন্য সিনেমা বানাতে চাই না। সময় নিয়েই সিনেমা বানাতে চাই।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ ভয়েস দিয়েছেন। কেউ কি বুঝতে পেরেছে?
নুহাশ হুমায়ূন: হ্যাঁ। কেউ কেউ পেরেছে, যারা খুব কাছের।
বাবার গল্প। ভয়েস দেওয়ার সময় কোনো ইমোশন কাজ করেছিল?
নুহাশ হুমায়ূন: এটা তো অবশ্যই ইমোশনাল ব্যাপার। বাবার মাধ্যমেই ভয়েস শব্দটার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। বাবার শ্রাবণ মেঘের দিন সিনেমায় একটা দৃশ্য ছিল, একজনকে সাপে কামড়েছে। সিনেমার ডাবিংয়ে বাবার সঙ্গে ছিলাম। তখন বাবাকে বলেছিলাম, বাবা আমি কিন্তু মেয়েদের মতো জোরে চিৎকার দিতে পারি। পরে সাপে কাটার দৃশ্যে জোরে মেয়েদের মতো কণ্ঠ নকল করে চিৎকার দিই। সিনেমায় আমার চিৎকারটা বাবা রেখেছিলেন। জীবনে প্রথম বাবার সিনেমায় ভয়েস দিই। এবার বাবা নেই, কিন্তু বাবার অ্যাডাপ্টেশনে আমিও আছি। বাবা দেখতে পারলে খুশি হতেন।
বাবার কোন কাজগুলো সিনেমায় দেখতে চান?
নুহাশ হুমায়ূন: মানুষ তো বলে, হিমু, মিসির আলির সিনেমা কবে আসবে। আসলে হিমু, মিসির আলির বাইরে বাবার অনেক সুন্দর সুন্দর গল্প আছে। সেগুলোও কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের পাঠকদের কাছে প্রিয়। তানিম নূর ভাই টিপিক্যাল গল্পগুলোর বাইরে কিছুক্ষণ উপন্যাস নিয়ে কাজ করেছেন, এটা খুবই ভালো লেগেছে। এ ছাড়া সিনেমায় যেভাবে নিজের একটা ভিশন যোগ করেছেন, সেটাও দারুণ।
‘মুভিং বাংলাদেশ’ এখন কী অবস্থায় আছে
নুহাশ হুমায়ূন: পাঁচ বছর ধরে সিনেমাটির সঙ্গে রয়েছি। প্রি-প্রোডাকশনের কাজ শেষ। এ মাস থেকেই শুটিংয়ে যাব। সবকিছু মিলিয়ে কিছুটা চিন্তার মধ্যেও রয়েছি। ঠিকভাবে এখন কাজটা শেষ করতে চাই।
হুলু, ডিজনির মতো বড় প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হলেন কীভাবে?
নুহাশ হুমায়ূন: ‘ফরেনার্স অনলি’ শর্ট ফিল্ম করতে গিয়ে হুলুর সঙ্গে পরিচয়। এটা ডিজনিও প্রযোজনা করেছে। আমাদের সিনেমায় শুধু বিদেশি নয়, দেশের পার্টনারও আছে। সেটা আমরা আপাতত ঘোষণা করছি না।
আপনার কাছে কেন মনে হয়েছিল হলিউডের বাজারে যাওয়া দরকার?
নুহাশ হুমায়ূন: এটা পরিকল্পনা করে হয়নি। ‘মশারি’ যখন সাউথ বাই সাউথইস্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার পায়, অস্কারের জন্য কোয়ালিফাই করে, তখন হলিউড থেকে একজন ম্যানেজার পাই। পরে রাইটার্স গিল্ডের সদস্য হই। পরিকল্পনা করে কিছু করিনি।
তরুণ নির্মাতাদের কাছে কোন কথাটা শুনতে হয় বেশি?
নুহাশ হুমায়ূন: অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, কীভাবে চলচ্চিত্র উৎসবে যেতে হয়। পথটা কী? তাঁদের একটা কথাই বলি, নিজের মতো সৎ থেকে কাজটা বানালে কাজটাই অটো পথ চিনিয়ে দেয়। আমাকে হলিউডে যেতে হবে এই চিন্তা করে সিনেমা বানাতে চাই না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সিনেমা নিয়ে আগ্রহ বা কী পরিবর্তন চোখে পড়েছে?
নুহাশ হুমায়ূন: এটা বলতেই হবে বাংলাদেশের সিনেমায় একটা ওয়েভ শুরু হয়েছে। আমার ষ সিরিজ রটারড্যাম উৎসবে গেল। ফেস্টিভ্যাল জার্নি থেকে মনে হয়েছে, আমার কাজ হোক বা (আবদুল্লাহ মোহাম্মদ) সাদের কাজ হোক, চলচ্চিত্র অঙ্গনে একটি বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। আমার মনে হয়, অনেকেই আমাদের কাজগুলো দেখে উৎসাহিত হয়েছেন। তরুণেরা বুঝতে পেরেছেন তাঁদের কাজ শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও জায়গা করে নিতে পারে। এ জন্য নিজের গল্পটা ঠিকঠাকমতো বানানো জরুরি।
ভারত, নেপাল, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার সিনেমাও কান, বার্লিনসহ বড় বড় উৎসবে যাচ্ছে, সেই তুলনায় আমাদের পিছিয়ে থাকার কারণ কী?
নুহাশ হুমায়ূন: আমাদের ইন্ডাস্ট্রির সাইজ কিন্তু বড় নয়। সেখানে ভারতে প্রতিবছর বহু সিনেমা প্রিডিউস হয়, সেখানে ১০০টা সিনেমা হলে দুই-চারটা তো বড় উৎসবে যাবেই। আমরা এখানে পিছিয়ে। তবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি আস্তে আস্তে গ্রো করছে। এটা বুঝতে হবে।
চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়া মানেই কি সিনেমাটি ভালো?
নুহাশ হুমায়ূন: উৎসবে যাওয়া মানেই সিনেমা শতভাগ ভালো, এটা আমি মনে করি না। আমার পছন্দের সিনেমার কথা যদি বলি, ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’ বা আমার বাবার সিনেমাগুলো, এগুলো তো সেভাবে ফেস্টিভ্যালে যায়নি। আমার মনে হয়, এখন থেকে ২০ বা ৫০ বছর পর এই সিনেমাগুলোকেই মানুষ মনে রাখবে। আবার এখন অনেক সিনেমা নানা চলচ্চিত্র উৎসবে যাচ্ছে, এগুলো মানুষের মনে থাকবে কি না জানি না। ইউরোপ-আমেরিকার দিকে এত বেশি তাকালে হবে না। ওদের রেসপেক্ট পেলেই আমাদের কাজটা ভালো হয়েছে, না হলে হয়নি, এমনটা আমি মনে করি না।
অনেকে ধরেই নেন, ইউরোপ-আমেরিকার স্বীকৃতি মানেই অসাধারণ কিছু...
নুহাশ হুমায়ূন: সে অর্থে এখন দুইটারই দরকার আছে। কমার্শিয়াল সিনেমা যেমন দরকার, আর্টিস্টিক সিনেমাও দরকার। আবার মিক্সও দরকার। নিজের কাজের কথাই যদি বলি, আমার ষ রটারড্যামে গেছে, সানড্যান্স উৎসব থেকে পুরস্কার পেয়েছে। আবার একই সময়ে দেশের দর্শকও সিরিজটি উপভোগ করেছেন। এটা আমি দর্শকদের জন্য বানিয়েছি, কোনো অ্যাওয়ার্ডের জন্য বানাইনি।
ভয়েস দিলেন, অভিনয় নিয়ে কোনো ইচ্ছা আছে?
নুহাশ হুমায়ূন: শৈশবে নিজের বানানো শর্টফিল্মগুলোয় অভিনয় করতাম। গল্প চরিত্র পছন্দ হলে অভিনয় করে ফেলতেই পারি (হাসি)।