‘কোহরা ২’-এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স
‘কোহরা ২’-এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

প্রবাসী তরুণীর মৃত্যু, হত্যা রহস্যের আড়ালে ভিন্ন বার্তা

ওটিটিতে ‘ক্রাইম থ্রিলার’ এক সহজ পথ। একটি মৃতদেহ, দুই তদন্তকারী, তাদের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, আর শেষে একটি ধাক্কা—এই ফর্মুলা অনুসরণ করে প্রতিবছর ডজন ডজন সিরিজ আসে। কিন্তু খুব কম কাজই আছে, যেগুলো রহস্যের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের গভীরে গিয়ে দাঁড়ায়। নেটফ্লিক্সের ‘কোহরা’ সেই বিরল ব্যতিক্রম। ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম মৌসুমেই পাঞ্জাবের ভৌগোলিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষতগুলো তুলে ধরেছিল সিরিজটি। সদ্য মুক্তি পাওয়া দ্বিতীয় মৌসুম সেই পথকে আরও বিস্তৃত করেছে। এবার গল্প শুধু হত্যাকাণ্ডের নয়; বরং মানুষের ভেতরে থাকা লোভ, রাগ ও ইতিহাসের না–বলা অধ্যায়ের।

একনজরেসিরিজ: ‘কোহরা ২’ধরন: ক্রাইম থ্রিলারপরিচালনা: সুদীপ শর্মা, ফয়সাল রহমানঅভিনয়: মোনা সিং, বরুণ সবতিস্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্সপর্বের সংখ্যা: ৬দৈর্ঘ্য: ৪৫–৫০ মিনিট

গল্পের শুরুটা খুব পরিচিত লাগে—ভোরবেলায় এক প্রবাসী নারীর মৃতদেহ পাওয়া যায়। নাম প্রীত (পূজা ভামরা)। মনে হয়, আবার একটি ক্ল্যাসিক ‘হু–ডান–ইট’ রহস্য শুরু হলো। কিন্তু প্রথম কয়েকটি পর্বেই পরিষ্কার হয়, নির্মাতাদের লক্ষ্য হত্যাকারী খোঁজা নয়; বরং সমাজের সেই ছায়াগুলোকে সামনে আনা, যেখান থেকে অপরাধ জন্ম নেয়।
তদন্তে আসেন নতুন অফিসার অমরপাল গরুন্ডি (বরুণ সবতি)। সঙ্গে আছেন বাইরে থেকে দেখতে কঠোর, কিন্তু ভেতরে–ভেতরে ভেঙে পড়া ডিএসপি ধনবন্ত কৌর (মোনা সিং)। একজন নতুন শুরু খুঁজছেন, অন্যজন অতীতের ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন। এই দুই চরিত্রের রসায়নই সিরিজটির আবেগপ্রবণ কেন্দ্র।

তদন্ত যত এগোয়, তত স্পষ্ট হয়—প্রীত যেন সমাজের চোখে ‘সমস্যাগ্রস্ত নারী’। স্বাধীন, রাগী ও আপসহীন। স্বামী তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, ভাই তাকে মেনে নিতে পারেনি, প্রেমিক তাকে বুঝতে পারেনি। এককথায়, সে এমন এক নারী, যে নিজের নিয়মে বাঁচতে চেয়েছিল। সিরিজ এখানে বড় প্রশ্ন তোলে—মৃত্যুর পরও কি একজন নারীকে চরিত্রহীন প্রমাণ করতে সমাজ এত ব্যস্ত থাকে? একেকটি সাক্ষ্য, একেকটি ফ্ল্যাশব্যাক যেন দেখায়—হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই প্রীত সামাজিক বিচারের মধ্যে বন্দী ছিল।

‘কোহরা ২’-এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

সিরিজের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক—এটি সরাসরি লেকচার দেয় না; বরং দৈনন্দিন আচরণের মধ্য দিয়ে পিতৃতন্ত্র দেখায়। অমরপাল নিজের ভুল বুঝেও চুপ থাকেন। ধনবন্ত কৌর অফিসে সহানুভূতি পেলেও সেটা সম্মান নয়; বরং নারী হিসেবে করুণা। এখানে পুরুষ চরিত্রগুলো খলনায়ক নয়, কিন্তু তাঁদের ছোট ছোট আচরণই দেখায়—সমাজ কীভাবে অসাম্যকে স্বাভাবিক করে তোলে।

অনেক সিরিজ লোকেশনকে পোস্টকার্ডের মতো ব্যবহার করে, অনেক সিরিজ দেখে মনে হয় ঝাঁ–চকচকে লোকেশন যেন ট্রাভেল ভ্লগ হিসেবেই এসেছে, গল্পের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। কিন্তু ‘কোহরা তা করে না। এখানে পাঞ্জাব মানে জমি বিরোধ, অভিবাসী শ্রমিকের যন্ত্রণা, রাজনৈতিক স্মৃতি এবং ইতিহাসের ভার। একজন ঝাড়খন্ডি শ্রমিক অরুণের সমান্তরাল গল্প প্রথমে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও ধীরে ধীরে বুঝি, এটাই আসল হৃৎস্পন্দন।

পাঞ্জাবের ছোট শহরের ধূসর আলো, শীতের কুয়াশা, ফাঁকা রাস্তা—সব মিলিয়ে এক চাপা অস্বস্তির আবহ তৈরি হয়। ‘কোহরা’ অর্থ কুয়াশা; এই কুয়াশা সত্যকে ঢেকে রাখে, আবার একই সঙ্গে সত্যের দিকেও ঠেলে দেয়।

সিরিজটি কেবল ধূসর দুনিয়ায় আলো ফেলেনি; মাঝেমধ্যে দর্শকদের স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আছে হাস্যরস ও সহকর্মীদের সঙ্গে খুনসুটি কিংবা মানালিতে ধাওয়ার দৃশ্য। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো সিরিজকে বাস্তব করে তোলে। কারণ, জীবনে যেমন শোক আর আনন্দ পাশাপাশি থাকে, এখানেও তা–ই।

‘কোহরা ২’-এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

ধনবন্ত নিজের সন্তানকে হারানোর শোক বয়ে বেড়ান। তাঁর বাড়ি যেন সময়ের বাইরে আটকে থাকা এক জায়গা। ছেলের সাইকেলে তালা ঝুলছে, স্মৃতিগুলো ঘন হয়ে বাতাসে মিশে আছে। তিনি অপরাধীদের খোঁজেন, কিন্তু আসলে লড়ছেন নিজের ভেতরের শূন্যতার সঙ্গে। শোক এখানে নিছক আবেগ নয়, প্রায় ভৌতিক উপস্থিতি, যা চরিত্রটিকে তাড়া করে ফেরে। এই চরিত্রে মোনা সিং যেন পুরো সিরিজের আত্মা। তিনি শক্ত, আবার ভাঙা। দৃঢ়, কিন্তু ক্লান্ত। তাঁর পারফরম্যান্স সিরিজটিকে অন্য মাত্রা দেয়।
অন্যদিকে অমরপালের জীবনও অমীমাংসিত অতীতের ভারে নুয়ে পড়েছে।

পরিবারের জমি, সম্পর্কের ভাঙন, নিষিদ্ধ সম্পর্কের স্মৃতি—সব মিলিয়ে তাঁর বর্তমান যেন ক্রমেই অতীতের কাছে জবাবদিহি করছে। বাড়ির ভেতরেই তিনি যেন অচেনা, কাজের মধ্যে ডুবে থাকাই তাঁর পালানোর পথ। সিরিজটি সূক্ষ্মভাবে দেখায়, অপরাধ শুধু আইনের চোখে নয়, মনের ভেতরেও বিচার চলে। এই চরিত্রে বরুণ সবতির অভিনয় ‘লাউড’ নয়; বরং নীরবতায় শক্তি খুঁজে পায়। একজন মানুষ যিনি ভুল করেছেন, কিন্তু বদলাতে চান, সেই দ্বিধা তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সহ–অভিনেতারাও দুর্দান্ত। প্রায় পার্শ্বচরিত্র মনে হলেও অরুণ ও জগদীশ—দুই পুরুষের গল্প সিরিজে সবচেয়ে গভীর মানসিক স্তর যোগ করেছে।

‘কোহরা ২’-এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

এই মৌসুমের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ দিক হলো সামাজিক পটভূমি। প্রীতের পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের প্রসঙ্গ কাহিনিকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিয়ে যায়। শ্রমিকদের শিকলে বেঁধে রাখা কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি বহু প্রজন্মের অন্যায়, যা অভিশাপের মতো ফিরে আসে।

‘কোহরা ২’ দ্রুতগতির থ্রিলার নয়। দৃশ্যগুলো সময় নেয়, নীরবতা ব্যবহার করে, চরিত্রকে শ্বাস নিতে দেয়। এক ঘণ্টার শেষ পর্ব যেন প্রমাণ করে—ধীরগতির গল্পও কতটা তীব্র হতে পারে, যদি নির্মাণের জোর থাকে।

সিরিজের গতি কিছু দর্শকের কাছে ধীর মনে হতে পারে। যাঁরা টান টান থ্রিলার দেখতে চান, সিরিজটি তাঁদের জন্য নয়। এটা আসলে রহস্যকে ব্যবহার করে সমাজের মুখ দেখানোর জন্য। এটাই এর শক্তি, আবার সীমাবদ্ধতাও। অনেক ক্রাইম সিরিজ যেখানে শুধু ‘টুইস্ট’ দেখাতে ব্যস্ত, ‘কোহরা’ সেখানে প্রশ্ন করে—অপরাধ কি হঠাৎ হয়, নাকি সমাজ তৈরি করে? এই প্রশ্নই সিরিজটিকে আলাদা করে।