
মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের জীবনের অন্যতম গভীর অনুভূতি। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা যখন মিথ্যা, প্রতারণা আর বিকৃত আবেশে রূপ নেয়, তখন তা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তারই শিউরে ওঠা উদাহরণ টেক্সাসের তরুণী রিগ্যান সিমন্স হ্যানককের হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনাকে ঘিরেই নির্মিত হয়েছে নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র ‘ম্যাটারনাল ইনস্টিংক্ট’। গত বৃহস্পতিবার মুক্তির থেকেই আবার আলোচনায় সেই ঘটনা।
২০২০ সালের অক্টোবরের এক সকালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের নিউ বোস্টন শহরে ২১ বছর বয়সী রিগ্যান সিমন্স হ্যানকককে নিজের বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তিনি তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন। কিন্তু তদন্তে যে সত্য বেরিয়ে আসে, তা শুধু স্থানীয় মানুষ নয়, পুরো দেশকে হতবাক করে দেয়।
মিথ্যার ওপর গড়ে ওঠা এক জীবন
এ ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র টেইলর পার্কার। ২০১৯ সালে ওয়েড গ্রিফিন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান তিনি। নিজের সম্পর্কে নানা গল্প বলতেন টেইলর; বড় সম্পত্তির উত্তরাধিকার, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, আর্থিক সচ্ছলতা—সবকিছু মিলিয়ে যেন নিখুঁত জীবনের ছবি।
কিন্তু সেই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর কথিত গর্ভধারণ। পরিবার, বন্ধু, এমনকি প্রেমিককেও টেইলর বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে তিনি সন্তানসম্ভবা। ভুয়া আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট, সাজানো চিকিৎসা পরামর্শ, এমনকি শিশুর লিঙ্গ প্রকাশের অনুষ্ঠানও আয়োজন করেছিলেন। করোনা মহামারির কারণে হাসপাতালে কাউকে সঙ্গে নেওয়া যায় না, এ অজুহাত দেখিয়ে তিনি বছরের পর বছর সত্য আড়াল করে রাখতে সক্ষম হন।
পরে আদালতে উঠে আসে, টেইলরের গর্ভধারণের পুরো গল্পই ছিল মিথ্যা। এমনকি তিনি আগে হিস্টেরেকটমি করিয়েছিলেন, অর্থাৎ তাঁর জরায়ুই ছিল না। ফলে গর্ভধারণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
পরিচয় রিগ্যানের সঙ্গে
এদিকে টেইলরের পরিচয় হয় রিগ্যান সিমন্স হ্যানককের সঙ্গে। রিগ্যান তখন সত্যিই অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং দ্বিতীয় কন্যাসন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন। পেশাগত সূত্রে দুজনের যোগাযোগ হয়েছিল। রিগ্যান একসময় টেইলরকে ফটোগ্রাফির কাজও দিয়েছিলেন।
এ পরিচয়ই পরে হয়ে ওঠে ভয়াবহ এক অপরাধের সূচনা।
সেই বিভীষিকাময় দিন
২০২০ সালের ৯ অক্টোবর সকালে রিগ্যানের বাড়িতে ঘটে যায় অকল্পনীয় ঘটনা। তদন্তকারীদের মতে, টেইলর পার্কার সেদিন রিগ্যানের বাড়িতে যান। সেখানে তাঁকে নির্মমভাবে আক্রমণ করা হয়। ছুরিকাঘাত ও মারাত্মক আঘাতে হত্যা করা হয় তরুণীকে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় ছিল—রিগ্যানের গর্ভ থেকে অনাগত শিশুকে বের করে নেওয়া হয়।
ঘটনার সময় বাড়িতে রিগ্যানের তিন বছরের মেয়ে উপস্থিত ছিল। সৌভাগ্যক্রমে শিশুটি শারীরিকভাবে আঘাত পায়নি।
হত্যার পর নবজাতককে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে যান টেইলর।
পুলিশের হাতে ধরা
একই দিন টেক্সাসের ডি কালব এলাকায় পুলিশ একটি গাড়ি থামায়। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন টেইলর পার্কার। তিনি দাবি করেন, তিনি সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন এবং শিশুটি শ্বাস নিচ্ছে না।
পুলিশ ও চিকিৎসাকর্মীরা দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানেই তাঁর গল্প ভেঙে পড়তে শুরু করে।
চিকিৎসকেরা জানান, টেইলরের শরীরে সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো—তাঁর জরায়ুই নেই।
ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, শিশুটি টেইলরের নয়। সে রিগ্যান সিমন্স হ্যানককের কন্যাসন্তান।
তদন্তে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর সত্য
তদন্তকারীরা ধীরে ধীরে পুরো ঘটনার চিত্র পুনর্গঠন করেন। তাঁদের মতে, মাসের পর মাস ধরে টেইলর যে ভুয়া গর্ভধারণের গল্প তৈরি করেছিলেন, সেটি ধরে রাখার জন্যই তিনি এ অপরাধ করেন।
টেইলর এমন একটি শিশুকে নিজের বলে পরিচয় করাতে চেয়েছিলেন, যাতে তাঁর দীর্ঘদিনের মিথ্যা ভেঙে না পড়ে।
ফরেনসিক প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য একত্রে তাঁকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে।
বিচার ও মৃত্যুদণ্ড
২০২২ সালে শুরু হয় টেইলর পার্কারের বিচার। শতাধিক সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। প্রসিকিউশন দাবি করে, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যা ও অপহরণের ঘটনা। সেই যুক্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে ক্যাপিটাল মার্ডারের অভিযোগ আনা হয়।
অবশেষে ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরে আদালত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন।
এরপর একাধিকবার আপিল করা হলেও রায় বহাল থাকে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি টেক্সাসের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের তালিকায় রয়েছেন। বর্তমানে টেক্সাসের নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
যে শিশুটি বেঁচে গেল
সবচেয়ে আশার বিষয়, রিগ্যানের গর্ভ থেকে উদ্ধার হওয়া কন্যাশিশু ব্র্যাক্সলিন সেজ বেঁচে যায়। চিকিৎসকদের তৎপরতায় নবজাতকটি সুস্থ হয়ে ওঠে এবং পরে পরিবারের কাছে ফিরে যায়। কিন্তু তার জন্মের গল্প চিরদিনের জন্য জড়িয়ে থাকবে এক ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে।
টাইম অবলম্বনে