‘ ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাগো আর তোমাকে ঘুমপাড়ানি মাসি হতে দেব না’, ‘সেই রেললাইনের ধারে মেঠো পথটার পাড়ে দাঁড়িয়ে’, ‘একতারা লাগে না আমার দোতারাও লাগে না’, ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে’, ‘আমি তোমার দুটি চোখের দুটি তারা হয়ে থাকব’—বাংলা গানের আকাশে যে গানগুলো আজও নরম বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে, সেসবের স্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। গান, দেশ, মানুষের প্রতি নিরন্তর ভালোবাসা আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি—সব মিলেই তিনি এক অনন্য উচ্চতার সংগীতব্যক্তিত্ব। গত ১ জানুয়ারি ছিল এই বরেণ্য শিল্পীর জন্মদিন।
আমাকে যেন ভুলে না যাও…
২০১৮ সালের জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন তিনি। কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে বিমানবন্দরে বসে নিজের তোলা সেই ছবির ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘আমাকে যেন ভুলে না যাও…তাই একটা ছবি পোস্ট করে মুখটা মনে করিয়ে দিলাম।’ আজ ছবিটা যেন এক অব্যক্ত চাওয়ার কথাই মনে করিয়ে দেয়—মানুষের ভালোবাসার কাছে তিনি চেয়েছিলেন বেঁচে থাকতে।
গতকাল তাঁর জন্মদিনে বড় কোনো আয়োজন হয়নি কোথাও। তবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই শেয়ার করেছেন তাঁর গান, তাঁর ছবি, তাঁর শেষ পোস্ট। লিখেছেন—‘আপনাকে ভুলিনি, স্যার।’ আসলে মানুষ কি কখনো ভোলেন এমন কাউকে, যিনি দেশের ইতিহাস, মানুষের হৃদয়ের গভীরে নিজেকে বুনে দিয়ে যান?
বড় আয়োজন না থাকলেও সংগীতাঙ্গনের অনেকে স্মরণ করেছেন প্রিয় এই মানুষটিকে। কেউ তাঁর গান পোস্ট করেছেন, কেউ শেয়ার করেছেন শেষ ছবিটি।
ক্লোজআপ ওয়ানের তারকা সালমা লিখেছেন, ‘আরেক জানুয়ারি আসলো, আবার তোমার জন্মদিন আসলো। শুধু তুমি ফিরে আসলে না বাবা…ওপারে ভালো থেকো বাবা…আজকের দিনে তুমি ৭০ বছর বয়সে পা ফেলতে।’
কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে বিমানবন্দরে বসে নিজের তোলা সেই ছবির ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘আমাকে যেন ভুলে না যাও…তাই একটা ছবি পোস্ট করে মুখটা মনে করিয়ে দিলাম।’
গুণী শিল্পী কনকচাঁপা লিখেছেন, ‘আমাদের আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আসলে বাংলার বুলবুল… একাধারে তিনি ছিলেন শক্তিমান লেখক, সুরস্রষ্টা এবং মিউজিক কম্পোজার…তিনি আসলে স্বভাবকবি ছিলেন, মুখে মুখে গান বানানোর অসম্ভব দক্ষতা ছিল তাঁর।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমরা পুরো জাতিই ধন্য যে আমাদের একজন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ছিলেন। আর যদি তিনি শুধু “সব কটা জানালা খুলে দাও না” গানটি–ই করতেন, তাহলেও বাংলাদেশ তাঁর কাছে সমান কৃতজ্ঞ থাকত।’
দুই প্রজন্মের দুজন শিল্পীর লেখায় ফিরে আসে এক অনিবার্য সত্য—তিনি শুধু সুরকার ছিলেন না, ছিলেন গভীর মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
কিশোর বয়সেই মুক্তিযুদ্ধে
১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। বাবা ওয়াফিজ আহমেদ, মা ইফাদ আরা নাজিমুন নেসা। আজিমপুরের স্কুলে পড়াশোনার সময়ই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ লড়াই।
মাত্র সাড়ে ১৪ বছর বয়সে তিনি যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। সেই কিশোর যোদ্ধাই পরবর্তীকালে দেশকে নিবেদিত অগণিত দেশাত্মবোধক গানের জন্ম দেন—যার প্রতিটিতেই ফুটে ওঠে স্মৃতি, বেদনা ও গর্ব।
দেশের গান থেকে চলচ্চিত্রের সুরের জগতে
মুক্তিযুদ্ধ শেষে হাতে তুলে নেন গিটার। একটানা আট বছর তিনি প্রায় শুধু দেশের গান করেন—যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যে গানগুলো মানুষের বুকের ভেতর সাহস জুগিয়েছে, পথ দেখিয়েছে, সেসব অমর সৃষ্টির পেছনে ছিল তাঁর কিশোর বয়সের রক্তক্ষরণ আর দ্রোহের আগুন। এরপর আসেন চলচ্চিত্রে।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে হাতে তুলে নেন গিটার। একটানা আট বছর তিনি প্রায় শুধু দেশের গান করেন—যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যে গানগুলো মানুষের বুকের ভেতর সাহস জুগিয়েছে, পথ দেখিয়েছে, সেসব অমর সৃষ্টির পেছনে ছিল তাঁর কিশোর বয়সের রক্তক্ষরণ আর দ্রোহের আগুন।
১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবির মাধ্যমে সংগীত পরিচালনায় তাঁর অভিষেক। কিন্তু প্রকৃত স্বীকৃতি ও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে দেন তাঁকে ১৯৮৪ সালের ‘নয়নের আলো’। ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বাবার মুখে’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমি তোমার দুটি চোখের দুটি তারা হয়ে থাকব’—এই গানগুলো হয়ে ওঠে প্রজন্মের সংগীত–স্মৃতি, বেদনা, প্রেম আর বিচ্ছেদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা।
শুধু চলচ্চিত্র নয়—বাংলাদেশের সামগ্রিক সংগীতধারাকেই তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সুরে গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আব্দুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, জেমস, আগুন, কনকচাঁপা, মনির খানসহ প্রায় সব তারকাই। তাঁদের কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়েছে ‘একতারা লাগে না আমার দোতারাও লাগে না’, ‘সেই রেললাইনের ধারে’, ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে’, ‘ও আমার আট কোটি ফুল দেখো গো মালি’, ‘যুদ্ধ এখনো থামেনি তাই তো তোমার ছেলে আসেনি’, ‘এই দেশটা আমার স্বপ্নে বোনা নকশিকাঁথার মাঠ’—যে গানগুলো শুনলেই বাংলার মাটি, মানুষের দুঃখ–বেদনা আর ভালোবাসার সুর যেন কানে বেজে ওঠে।
তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পাশাপাশি জনপ্রিয় টেলিভিশন রিয়েলিটি শো ‘ক্লোজআপ ওয়ান’–এর বিচারক হয়ে নতুন প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করেছেন।
তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পাশাপাশি জনপ্রিয় টেলিভিশন রিয়েলিটি শো ‘ক্লোজআপ ওয়ান’–এর বিচারক হয়ে নতুন প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর সুর করা ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাগো আর তোমাকে ঘুমপাড়ানি মাসি হতে দেব না’, ‘এই দেশ আমার সুন্দরী রাজকন্যা’, ‘একাত্তরের মা জননী’—এসব গান শুধু নির্মিত সুর নয়, এগুলো একেকটা সময়ের কণ্ঠস্বর, মানুষ ও দেশের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর গানে পাশাপাশি এসেছে প্রেম–বিরহ, প্রতিবাদ–অভিমান, শিশুর নিষ্কলুষতা আর দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।
‘ক্লোজআপ ওয়ান’ প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে শুধু গান বিচারই করেননি, অংশগ্রহণকারীদের পিতৃতুল্য স্নেহে আগলে রাখতেন। সালমাসহ অনেক তরুণ শিল্পী তাঁর কাছ থেকে পেয়েছেন পরামর্শ, সাহস আর ভরসা—যা তাঁদের জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে।
বোহেমিয়ান জীবন, সহজ মানুষটি
ব্যক্তিজীবনে ছিলেন সাদামাটা, নিরহংকার, প্রায় বোহেমিয়ান স্বভাবের। নিজের জন্য তেমন কিছুই করেননি—বরং জীবনের সবকিছু ছেড়ে দিয়ে গানকেই করেছিলেন একমাত্র সঙ্গী। নতুন কণ্ঠ খুঁজে বের করা, তরুণ শিল্পীদের সাহস জোগানো—এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় আনন্দ। অনেকের ভাষায়, তিনি ছিলেন শিল্পীদের অভিভাবকসুলভ এক মানুষ। ‘ক্লোজআপ ওয়ান’ প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে শুধু গান বিচারই করেননি, অংশগ্রহণকারীদের পিতৃতুল্য স্নেহে আগলে রাখতেন। সালমাসহ অনেক তরুণ শিল্পী তাঁর কাছ থেকে পেয়েছেন পরামর্শ, সাহস আর ভরসা—যা তাঁদের জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে। শুধু রিয়েলিটি শোর প্রতিযোগীরাই নন, অডিও–জগতের অনেক শিল্পীও তাঁর হাতে নতুন করে পথ খুঁজে পেয়েছেন। মনির খানসহ বেশ কিছু জনপ্রিয় শিল্পীর ক্যারিয়ারের শুরু ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠার পেছনে বুলবুলের অবদান ছিল নীরবে, গভীরভাবে।
নিজে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রও বাজাতেন—গিটার, বেহালা, কি–বোর্ড—সবকিছুতেই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। সুরের গভীরে ডুবে থাকতে পছন্দ করতেন তিনি। অনেক রাত জেগে গান বানাতেন, আবার কখনো কখনো নিজের লেখা গানটাই ছিঁড়ে ফেলতেন—বিশ্বাস করতেন, সত্যিকারের ভালো গান কখনো হারায় না। অনেক গান তিনি নিজেই লিখতেন—ফলে কথা ও সুর যেন একই শ্বাসে জন্ম নিত।
নিজে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রও বাজাতেন—গিটার, বেহালা, কি–বোর্ড—সবকিছুতেই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। সুরের গভীরে ডুবে থাকতে পছন্দ করতেন তিনি। অনেক রাত জেগে গান বানাতেন, আবার কখনো কখনো নিজের লেখা গানটাই ছিঁড়ে ফেলতেন—বিশ্বাস করতেন, সত্যিকারের ভালো গান কখনো হারায় না।
২০১৮ সালের ১৬ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন—ছয় বছর প্রায় ঘরবন্দী থেকে তাঁর হার্টে ধরা পড়েছে আটটি ব্লক। পরে তাঁর হৃদ্যন্ত্রে বসানো হয় দুটি স্টেন্ট। চিকিৎসা চলছিল, কাজও চলছিল—গানের প্রতি টান এক মুহূর্তের জন্যও কমেনি। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি চলে যান না–ফেরার দেশে। তাঁর বিদায়ের পরই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সত্যটি—তিনি ছিলেন সুরের এক নীরব সৈনিক, নিজের জীবন নয়, গানটাই ছিল তাঁর আসল পরিচয়।