প্রায় দেড় বছর ধরে একধরনের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল নাট্যাঙ্গন। কমে যাচ্ছিল নাটক নির্মাণ। আবার নির্মিত নাটকের জন্য পাওয়া যাচ্ছিল না স্পনসর। ঢাকার বাইরে শুটিং নিয়েও ছিল নিরাপত্তার শঙ্কা। নির্বাচনের পর সেসব অনিশ্চয়তার অনেকটাই কেটেছে। ঈদ কেন্দ্র করে গত বছরের চেয়ে শুটিং বেড়েছে ৫০-৬০ শতাংশ। মিলছে স্পনসরও। তবে স্বস্তির পাশাপাশি কিছু অস্বস্তির কথাও জানালেন নাট্যাঙ্গনের কেউ কেউ।
‘সবার মধ্যেই নির্বাচনের পর কাজ নিয়ে উৎফুল্লতা লক্ষ করছি। চারপাশে যাঁদেরই দেখছি, সবাই শুটিং করছেন। স্বাধীনভাবে কাজ করছেন। স্বস্তির একটি পরিবেশ দেখছি। আমাদের নির্মাতাদের জন্য এটা খুবই আনন্দের খবর,’ কথাগুলো বললেন নির্মাতা মোস্তফা কামাল রাজ।
তিনি জানালেন, গতবারের চেয়ে অনেকাংশে কাজ বাড়ছে, নাটকের বাজেট বাড়ছে। এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘আমার কথাই যদি বলি, গত বছর অনেক চেষ্টার পর স্পনসর পেয়েছি; কিন্তু এ সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। বেশির ভাগ নাটক স্পনসর–সংকটে মুক্তি দেয়নি। রোজার আগেই এবার আমার সব নাটকের স্পনসর, টেলিভিশন রাইট বিক্রি হয়ে গেছে। সবার মধ্যে কাজ নিয়ে মানসিক একটি স্বস্তি আছে। এটা অবশ্যই স্বস্তির খবর।’
কাজ বেড়েছে ৫০ শতাংশ
দুই থেকে তিন বছর আগেও প্রতি ঈদে ৫০০ থেকে ৬০০ নাটক প্রচারিত হতো। গত কয়েক বছরে সেটা কমে ২০০ থেকে ১৫০–এ এসে দাঁড়ায়। গত দুই বছরের তুলনায় এবার বেশি নাটক প্রচারিত হবে। প্রযোজকেরা বলছেন, বিনিয়োগে দোটানা কেটে গেছে। নতুন সরকার কার্যক্রম শুরুর পর সবাই কাজ করতে উৎসাহিত হচ্ছেন। প্রযোজকদের সংগঠন টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি মনোয়ার পাঠান বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ সময় একটা অস্বস্তির মধ্যে ছিলাম। সামনে কী হবে, এই প্রশ্ন ঘুরছিল। এবার গতবারের চেয়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কাজ বাড়বে নিশ্চিত।’ অভিনেতা শামীম হাসান সরকার বললেন, ‘গতবার একটি শঙ্কা ছিল। তবে এবার আগের চেয়ে কাজ বাড়ছে। কোনো অনিশ্চয়তা নেই। পরিবেশ ভালোই মনে হচ্ছে। আশপাশেও দেখছি, সহকর্মীরা সবাই নিয়মিতই কাজ করছেন। প্রাধান চরিত্র থেকে পার্শ্বচরিত্র—সবার কাজ বাড়ছে।’
যোগ হচ্ছে আটকে যাওয়া নাটক
স্পনসর–সংকটের কারণে গত বছর নাটক রিলিজ করতে পারেনি অনেক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। সিএমভির কর্ণধার শাহেদ আলী জানালেন, এ বছর তাঁরা ১৪–১৫টি নাটক প্রচার করবেন। এসবের মধ্যে বড় তারকা ও বড় বাজেটের ৫টি নাটক গত বছরের। অন্যান্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেরও একই চিত্র। অভিনেতা মুশফিক আর ফারহান জানালেন, ঈদে প্রচারিতব্য তাঁর ৬০ শতাংশ কাজই গত বছর করা।
শাহেদ আলী জানালেন, ইতিমধ্যে ৭০ শতাংশ নাটকের স্পনসর পেয়ে গেছেন তিনি। ৩০ শতাংশের স্পনসরও শিগগির পাবেন, আশা করছেন। তিনি বলেন, ‘বড় বড় বেশ কিছু লগ্নিকারী এখনো মার্কেটে আসছে না। সবাই এলে কাজের পরিবেশ আরও বেশি স্বস্তিদায়ক হবে। তবে নাটকের বাজেট বেড়েছে, ৪০ মিনিটের নাটক এখন ৮০-৯০ মিনিট হয়েছে। কিন্তু স্পনসররা রেট বাড়ায়নি, ৪০ মিনিটের নাটক হিসেবে অর্থ বরাদ্দ করছে।’
স্বস্তির সঙ্গে অস্বস্তি
জানুয়ারির শেষ দিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শুটিং নিয়ে কিছু অস্বস্তির কথা বলেছিলেন অভিনেতা মুশফিক আর ফারহান। কখনো ঢাকার বাইরে আউটডোর শুটিংয়ে বাধা, কখনো কোনো এলাকায় শুটিং বন্ধ করে দিতেন লোকজন। এসব কারণে কখনো কখনো শুটিং বন্ধ রেখেই চলে আসতে হয়েছে। ঝুলে পড়েছে বেশ কিছু কাজ। যে কারণে ঝুঁকি নিয়ে খুব বেশি কাজ করেননি।
নির্বাচনের পর ঢাকার বাইরে শুটিং না করলেও ঢাকার মধ্যে শুটিং করতে গিয়ে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এই অভিনেতা, ‘শনিবারে পুরান ঢাকায় একটি শুটিংবাড়িতে কাজ করছিলাম। প্রথমে দেখি, ৫ মিনিট পরপর জেনারেটর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একসময় পুরোপুরিই বন্ধ হয়ে গেল। পরে পরিচালকের কাছে শুনলাম, একদল লোক এসে চাঁদা চেয়েছে। না দিলে শুটিং করতে দেবে না। আমি কঠোরভাবে বলে দিয়েছিলাম, টাকা বড় কথা না। কোনো চাঁদা দেওয়া যাবে না। এদিকে শুটিং করতে দেয় না। পরিচালককে পরে বাধ্য হয়ে চাঁদা দিতে হয়েছে। এই ঘটনা আমার কাছে ভালো লাগেনি। এখন ঢাকার বাইরে শুটিং স্বস্তির নাকি অস্বস্তির হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না। আতঙ্ক কাটছে না।’
ওই নাটকের পরিচালক ছিলেন মহিদুল মহিম। তিনি জানালেন, টাকা না দিলে শুটিংয়ে ফেঁসে যেতেন। সময়ের কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছেন।