জীবনে ৫টা গানের চেয়ে ৫টা সিনেমার আবহসংগীত করতে চাই

অভিষেক ভট্টাচার্য। ছবি: অভিষেকের সৌজন্যে
অভিষেক ভট্টাচার্য। ছবি: অভিষেকের সৌজন্যে
‘ষ’–র কাজ করছেন তখন নুহাশ হুমায়ূন। একদিন বন্ধু অভিষেক ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা হতেই বললেন, হরর সিরিজটির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করে দিতে হবে। সেই শুরু। এরপর একে একে করেন ‘ফরেনার্স অনলি’, ‘কালপুরুষ’, ‘২ষ’। বর্তমানে ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’ সিনেমা, জুলাই বিপ্লব নিয়ে একাধিক তথ্যচিত্রসহ বেশ কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত এই তরুণ আবহসংগীত পরিচালক। অভিষেকের আরও খবর জানাচ্ছেন মনজুরুল আলম

মা গান পছন্দ করতেন। শৈশবে মায়ের কোলেই সংগীতে হাতে খড়ি। পরে গানই হয়ে ওঠে অভিষেক ভট্টাচার্যের ধ্যানজ্ঞান। বাফা ও ছায়ানট থেকে সংগীতের পাঠ নিয়েছেন। শুরুতে ভাবতেন গায়ক হবেন। স্কুল-কলেজে গান গেয়ে বন্ধুদের প্রশংসাও পেয়েছেন। তবে সিনেমার গান বরাবরই তাঁকে আকৃষ্ট করত। একদিন বলিউড সিনেমা স্বদেশ–এর আবহসংগীত শুনে মনটা আটকে যায়। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেন, গায়ক নয়, সিনেমায় আবহসংগীত নিয়েই কাজ করবেন। তখন তাঁর বয়স ১৪ বছর।

অভিষেক ভট্টাচার্য। ছবি: অভিষেকের সৌজন্যে

অনুপ্রেরণার নাম এ আর রাহমান
‘স্বদেশ সিনেমার মিউজিক শুনে প্রথম কেঁদেছিলাম। এতটাই ভালো লেগেছিল! একটি সিনেমাকে কতটা বদলে দিতে পারে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে এ আর রাহমানের সংগীত। দৃশ্যে গানের চেয়ে আবহসংগীতের ভেরিয়েশন আমাকে মোহিত করে। তখনই ঠিক করি, জীবনে পাঁচটা গানের চেয়ে পাঁচটা সিনেমার আবহসংগীত করব,’ বলছিলেন অভিষেক। পরবর্তী সময়ে এ আর রাহমানের কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজস্ব ঘরানায় চর্চা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘এ আর রাহমানের আবহসংগীতই আমার চিন্তাভাবনা বদলে দিয়েছে।’

২৩ বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী
সিনেমার আবহসংগীত করাই ছিল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণে নিজেই শিখতে থাকেন হারমোনিয়াম, ঢোল, তবলা, সেতার, বাঁশিসহ ২৩টি বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। কিছু বাদ্যযন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখেন, বাকিগুলো ইউটিউব দেখে। তিনি মনে করেন, ‘যেকোনো কিছু শিখতে থাকলে উপায় একটা না একটা বের হবেই।’ সে সময় বন্ধুদের সঙ্গে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও মিউজিক্যাল ফিল্মে কাজ করেছেন। নিজের শেখার সুবিধার জন্য বাসায় স্টুডিওও বানিয়ে ফেলেন। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের টিমে ক্লায়েন্ট ডিলিংয়ের কাজ করতেন। একপর্যায়ে একটি রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম প্রকাশ করেন, যাতে চারটি গান ছিল। অ্যালবামটি তাঁকে শিল্পী মহলে পরিচিত করে তোলে।

অভিষেক ভট্টাচার্য। ছবি: অভিষেকের সৌজন্যে

হঠাৎ নুহাশের প্রস্তাব
তরুণ নির্মাতা নুহাশ হুমায়ূনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। অ্যালবাম প্রকাশের পর এক দাওয়াতে নুহাশের সঙ্গে দেখা। অভিষেক জানান, ‘নুহাশ জানত আমি ইনস্ট্রুমেন্ট বাজাই। মিউজিকগুলোও সে আগেই শুনেছিল। তখন সে জানায়, দেশীয় লোককথা নিয়ে হরর সিরিজের কাজ করছে। জিজ্ঞেস করে, আমি কি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করব? এমন সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলাম। পরে চিত্রনাট্য পড়ে ডেমো পাঠাতে থাকি। ও পছন্দ করে। এভাবেই শুরু।’

চ্যালেঞ্জ দিয়েই যাত্রা
হররধর্মী কাজ করতে গেলে সাধারণত বিদেশি হরর সিনেমার আবহসংগীত অনুসরণ করা হয়। তবে নুহাশ কাজের স্বাধীনতা দেন, আর অভিষেক নিজস্ব ঘরানায় তৈরি করতে থাকেন মিউজিক। দেশীয় যন্ত্র ব্যবহার করে মৌলিক ট্র্যাক বানান। ‘মূল চ্যালেঞ্জ ছিল দর্শককে ভয় পাইয়ে দেওয়া। ‘ষ’–এ আমরা দেশীয় নূপুর, শিশুদের ফিসফিস করে কবিতা আবৃত্তির মতো নানা অ্যাম্বিয়েন্স দেশীয় যন্ত্র দিয়ে তৈরি করেছি। এমনকি সাধারণ শব্দ দিয়েও ভয়ের পরিবেশ তৈরির এক্সপেরিমেন্ট করেছি।’ সিরিজটি মুক্তির পর প্রশংসা পান অভিষেক।

২ষ এর পোস্টার

‘ষ’ থেকে ‘২ষ’
প্রথম কাজের পরই ব্যস্ততা বাড়ে। ‘২ষ’ দিয়েও প্রশংসিত হন অভিষেক। ভালোবাসা দিবসের নাটকের আবহসংগীত নিয়েও এখন ব্যস্ত। ইতিমধ্যে দুটি সিনেমায় কাজের প্রস্তাব পেয়েছেন। চলতি বছরেই সেগুলোর কাজ শুরু করবেন বলে জানান।
অভিষেক বলেন, ‘অরিজিনাল ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের জন্য অস্কার পুরস্কার রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে স্বীকৃতি নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রেফারেন্স ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাই এ পেশাকে কেউ গুরুত্ব দিতে চান না। আমি চাই, এখান থেকে যেন একটা জেনারেশন তৈরি হয়—যারা শুধুই আবহসংগীত নিয়ে ভাববে, কাজ করবে।’