‘যথেষ্ট পেয়েছি। আমি সন্তুষ্ট। জীবন নিয়ে কোনো খেদ নেই’, দুই বছর আগে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এভাবেই বলেছিলেন মাসুদ আলী খান। ৬ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন, সে উপলক্ষেই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল। দুই বছর পর সেই অক্টোবরেই চলে গেলেন। গতকাল বিকেলে ঢাকায় নিজ বাসায় মারা যান এই গুণী অভিনেতা। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর।
১৯৫৬ সালে মাকসুদুস সালেহীন ও বজলুল করিম গড়ে তোলেন ড্রামা সার্কেল। দলটিকে বলা হয় ঢাকার প্রথম আধুনিক নাট্যদল। প্রায় শুরু থেকেই দলটির সঙ্গে ছিলেন মাসুদ আলী খান। ড্রামা সার্কেলের হয়ে ‘রক্তকরবী’, ‘বহিপীর’, ‘রাজা ও রাণী’, ‘ইডিপাস’, ‘আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান’, ‘দৃষ্টি’সহ বহু নাটকে অভিনয় করেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে দলটি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত এখানে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
ঢাকায় টেলিভিশন কেন্দ্র চালু হওয়ার পর নূরুল মোমেনের নাটক ভাই ভাই সবাই দিয়ে ছোট পর্দায় অভিষেক মাসুদ আলী খানের। সাত দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রায় ৫০০ নাটকে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে হয়ে ওঠেন বাংলা নাটকের চেনা মুখ। ‘কূল নাই কিনার নাই’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘একান্নবর্তী’, ‘পৌষ ফাগুনের পালা’র মতো আলোচিত নাটকে কাজ করেছেন গুণী এই অভিনেতা। চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও নজর কেড়েছেন। সাদেক খানের ‘নদী ও নারী’ দিয়ে বড় পর্দায় তাঁর পথচলা শুরু। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে আছে ‘মাটির ময়না’, ‘মোল্লাবাড়ীর বউ’, ‘দুই দুয়ারী’।
সব মিলিয়ে জীবন বা ক্যারিয়ার নিয়ে মাসুদ আলী খানের কোনো আক্ষেপ ছিল না। ২০২২ সালে জন্মদিন উপলক্ষে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘মনে হয়, দেখলাম তো অনেক, আর কীই-বা দেখার আছে, পাওয়ার আছে। যদিও মানুষ বলে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হয় না। আমার তা কখনোই মনে হয় না। যথেষ্ট পেয়েছি।’
১৯২৯ সালে মাসুদ আলী খানের জন্ম মানিকগঞ্জের পারিল নওধা গ্রামে, নানাবাড়িতে।
বাবা আরশাদ আলী খান ছিলেন সরকারি চাকুরে। থাকতেন কলকাতায়। মা সিতারা খাতুন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মাসুদ তৃতীয়। মা তাঁকে আদর করে ডাকতেন ‘মাখন’ আর বাবা ‘নিজাম’। ১৯৪৯ সালে মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিক পড়তে ঢাকা আসেন, ১৯৫২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। দুই বছর পর জগন্নাথ কলেজ থেকে বিএ।
চাকরিজীবনে সরকারের নানা দপ্তরে কাজ করেছেন মাসুদ আলী খান। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সচিব হিসেবে চাকরি থেকে অবসর নেন।
১৯৫৫ সালে তাহমিনা খানকে বিয়ে করেন মাসুদ আলী খান। ব্যক্তিজীবনে এই অভিনেতার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে মাহমুদ আলী খান যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী। আর মেয়ে নাজমা খান ঢাকাতেই থাকেন। অভিনয়ের জন্য একুশে পদক পেয়েছেন মাসুদ আলী খান। এ ছাড়া ১৯৯৯ সালে মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কারে পেয়েছিলেন সমালোচক পুরস্কার, চলতি বছর এ পুরস্কার অনুষ্ঠানেই তাঁকে দেওয়া হয় আজীবন সম্মাননা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ইচ্ছা অনুযায়ী আজ বাদ জুমা দ্বিতীয় জানাজা শেষে মানিকগঞ্জের খান বানিয়াপাড়া গ্রামে মাসুদ আলী খানের দাফন সম্পন্ন হবে। এর আগে সকালে ঢাকায় হবে প্রথম জানাজা।
উনি আমার ভাই ছিলেন, বন্ধু ছিলেন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নির্মাতা
মাসুদ আলী ভাই আমার একান্নবর্তী ও ৬৯ ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। একজন অভিনেতার বাইরে উনি আমার ভাই ছিলেন, বন্ধু ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আড্ডার প্রতিটি স্মৃতি ভোলার নয়। একটা কথা আমি কখনো কোথাও বলিনি। উনি যখন র্যাংগসে চাকরি করতেন, একদিন তাঁর অফিসে গিয়ে আমার একটি শর্ট ফিল্মে তাঁকে অভিনয়ের প্রস্তাব দিই। তখন আসলে আমি কিছুই বানাইনি। ওই শর্ট ফিল্মটা
আর বানানো না হলেও তাঁর অফিসে এর পর থেকে প্রায়ই যেতে থাকলাম। প্রায়ই দুপুরে ভাত খেতে যেতাম ভাইয়ের অফিসে। এই ঢাকা শহরে আমার যতগুলো ভাত খাওয়ার জায়গা ছিল, তার মধ্যে ভাইয়ের অফিস ছিল একটি।
আরেকজন বাবা চলে গেলেন
অপি করিম, অভিনয়শিল্পী
উনি একজন ফাদার ফিগার ছিলেন। পর্দা, পর্দার বাইরেও ওনাকে সব সময় বাবা হিসেবেই পেয়েছি। দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। কত আড্ডা, কত স্মৃতি। খুব সুন্দর একটা বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়ে গেছেন। কিছুদিন আগেও আমিসহ কয়েকজনকে দেখতে চেয়েছিলেন, খুব সুন্দর একটা সময় কাটিয়েছিলাম। আমার বাবাকে হারানোর পর, আজ আমার আরেকজন বাবা চলে গেলেন।