রক্তমাখা খালি গা, এক হাতে চাপাতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তৌসিফ মাহবুব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘চক্র ২’–এর ফার্স্টলুক দেখে অনেকেই মন্তব্য, এআই দিয়ে তৈরি ছবি। তৌসিফ মাহবুব জানান, পুরোটাই বাস্তব, চরিত্রটির এই ফিটনেসের জন্য জিম থেকে ডায়েট—সবই করতে হয়েছে। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে নাটকে অভিনয়ের পর তৌসিফ মাহবুব অনুভব করছিলেন, দর্শকদের সামনে নতুন কিছু নিয়ে আসা প্রয়োজন। নাটকের প্রথাগত ছাঁচ থেকে বের হতে চেয়েছিলেন। খুঁজতে থাকেন ভালো গল্প, তবে জুতসই হচ্ছিল না। অবেশেষ চক্রর গল্প শুনে মনে হয়—এমন কিছুরই অপেক্ষায় ছিলেন। তৌসিফ বলেন, ‘নাটকের দর্শকেরা আমাকে একইভাবে দেখতে দেখতে আসলে একঘেয়ে হয়ে যাবে কি না, এ রকম একটা চিন্তাভাবনা কয়েক বছর ধরে নিজের মধ্যে কাজ করছিল। নাটকের পরে আসলে কি? আমাদের ক্যারিয়ারে তো প্রমোশন তো দরকার হয়। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মানুষ অর্থ খরচ করে কনটেন্ট দেখে, এই “পেইড অডিয়েন্স”-এর অভ্যাস তৈরির চ্যালেঞ্জটি নিতে চেয়েছিলাম।’
ভিকি জাহেদ পরিচালিত ‘চক্র ২’ নামের সিরিজটি ঈদে আইস্ক্রিনে মুক্তি পাবে। গতকাল দুপুরে প্রকাশ পেয়েছে সিরিজটির ফার্স্টলুক পোস্টার।
কেন ‘চক্র’ দিয়েই অভিষেক
দুই বছর আগে মুক্তি পায় ‘চক্র’–এর প্রথম মৌসুম। ওয়েব সিরিজ হিসেবে মুক্তি পেলেও এটাকে টিভি সিরিয়াল হিসেবে বানানো হয়েছিল। তখনই ঘোষণা আসে দ্বিতীয় সিজন ওয়েব সিরিজ হিসেবে আসবে। তাই এবারই ওটিটির ‘আসল অভিষেক’ হচ্ছে। এরপর দুই বছরের অপেক্ষা। এর মাঝে তৌসিফের কাছে ওটিটির বেশ কিছু বড় কাজের প্রস্তাব আসে। তবে অভিনেতার মনে হয়েছিল, গল্পগুলো তিনি আগেও নাটকে করেছেন। তাই ফিরিয়েছেন একাধিক প্রকল্প। তৌসিফ বলেন, ‘যে গল্পগুলো আমার কাছে এসেছিল, তখন মনে হয়েছে একই জিনিস নাটকে ১২ বছর ধরে করছি। একবারের জন্যও মনে হয়নি গল্প ও চরিত্রের ভিন্নতা আছে। কিন্তু চক্রের এ চরিত্রটার মতো কিছু আমি কখনো করিনি। প্রথম মৌসুম থেকে এবার চরিত্রের অনেক স্তর যুক্ত হয়েছে। পুরো বিষয়টা শোনার পর মনে হয়েছিল চরিত্রটি দিয়ে ওটিটির দর্শকেরা আমাকে নতুনভাবে দেখতে পাবেন।’
চক্রর প্রথম মৌসুমের মতোই দ্বিতীয়টিতেও তৌসিফকে ‘হুমায়ূন’ চরিত্রে দেখা যাবে। তবে এবার চরিত্রটির কয়েকটি ভিন্ন দিক বা রূপ সামনে আসবে। প্রথম সিজনের শুটিংয়ের পর চার বছরে নিজেকে আরও পরিণত করেছেন তৌসিফ। তাঁর মতে, আগের হুমায়ূন আর এখনকার হুমায়ূনের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তৌসিফ বলেন, ‘গত তিন-চার বছরের মধ্যে অভিনয়ে যতটুকু উন্নতি করতে পেরেছি, তার পুরোটা ঢেলে দিয়েছি। শুটিং চলাকালীন অন্য কোনো কাজও করিনি। চরিত্রের লুক ও মেজাজ ধরে রাখার জন্য কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।’
ভিকি জাহেদের সঙ্গে দীর্ঘ রসায়ন
অভিনেতা তৌসিফ আর পরিচালক ভিকি জাহেদের কাজের রসায়ন দীর্ঘদিনের। ২০১৬ সালে দেয়াল স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তাঁদের প্রথম কাজ। সবশেষ ‘খোয়াবনামা’ দিয়ে আলোচনায় ছিলেন এ জুটি। কবরে সাপের সঙ্গে তৌসিফের শুয়ে থাকার একটি দৃশ্য আলোচনায় ছিল। তৌসিফের মতে, তাদের দুজনের রুচি ও চলচ্চিত্র ভাবনার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। অভিনেতা বলেন, ‘প্রিয় সিনেমা থেকে নির্মাতা, আমাদের অনেক কমন জিনিস আছে। দুজনেই বাইরের সিনেমা বেশি দেখি, সেখানেও দুজনের পছন্দের তালিকা এক। দীর্ঘ ১০ বছরের এই পথচলায় আমাদের বোঝাপড়া এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, একে অপরের সৃজনশীল স্পেসকে সম্মান করি, একে অপরকে ফিডব্যাক দিয়ে কাজকে আরও সমৃদ্ধ করি।
প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি
ক্যারিয়ারের শুরু থেকে বড় পর্দায় অভিনয়ের স্বপ্ন দেখেছেন তৌসিফ। এক যুগের এ জার্নিকে এর প্রস্তুতি হিসেবেই মনে করেন এ অভিনেতা। তিনি বলেন, ‘আমি আসলে সিনেমা করতে চাই, এটা নিয়ে লুকানোর কিছু নেই। নাটক করেছি, করছি—এখন ওটিটিতে দেখবেন দর্শক। এভাবেই বড় পর্দায় কাজ করতে চাই। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমি চরিত্রের বিবর্তনে বিশ্বাসী। ২৪ বছরে যেমন মনে হতো ৩০ বছরের চরিত্রটা কখন করব, ঠিক এখন ৩৬ বছর বয়সেও অপেক্ষায় আছি ৪০ বছরের চরিত্রটার জন্য।’
‘অপ্রাপ্তি’ শব্দটা জীবন থেকে ফেলে দিয়েছেন তৌসিফ। কয়েক বছর আগেও তাঁর মাঝে কোনো কিছু না পাওয়ার আক্ষেপ কাজ করত, কিন্তু এখন তিনি আর তা মনে করেন না। তৌসিফ বলেন, ‘২০২২ সালে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার না পাওয়ায় মন খারাপ করেছিলাম, তখন তার মনে হয়েছিল এটি একটি বড় অপ্রাপ্তি। তবে ২০২৪ সালে যখন অন্য একটি কাজের জন্য পুরস্কারটি পাই, তখন উপলব্ধি হয় সবকিছু আসলে সঠিক সময়েই ধরা দেয়। পুরস্কার পাওয়া মানে আমার সব আক্ষেপ চলে গেছে, এমন নয়। বরং এই প্রাপ্তির সময়টাই আমাকে শিখিয়েছে—কোনো কিছুই আগেভাগে পাওয়ার নয়। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক সময়েই সব প্রাপ্তি ঘটে।’