
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেনের নতুন সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’–এর প্রিমিয়ার হয়ে গেল গত রোববার। প্রিমিয়ারের পর সিনেমাটির প্রশংসা করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
‘সৌন্দর্যের আয়নায় ভয়, সম্ভাবনার অপূর্ণ গল্প’ শিরোনামের রিভিউয়ে ইন্ডিওয়্যার লিখেছে, ‘বিয়ের আগে বিউটি পারলারে সাজগোজ—সাধারণত আনন্দ আর নতুন জীবনের প্রস্তুতির ছবি। কিন্তু সেই ঝলমলে আয়নার ঘর, ফুল, রেশমি কাপড় আর নিখুঁত সৌন্দর্যের আয়োজন যদি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে আতঙ্কের জায়গা? রুবাইয়াত হোসেনের নতুন ছবি “দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড” ঠিক সেই অস্বস্তিকর আশঙ্কাটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।’
সিনেমাটিতে বিউটি পারলার আর বাইরের ঢাকার চিত্র দেখিয়ে নির্মাতা যেভাবে বৈষম্য ফুটিয়ে তুলেছেন, সেটার প্রশংসা করা হয়েছে। ‘ঢাকার একটি বিলাসবহুল বিউটি পারলারকে ঘিরে ছবির গল্প। বাইরে থেকে সেটি সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের এক চকচকে জগৎ—দামি কাপড়, তাজা ফুল, আলোয় সাজানো আয়না আর লাল-গোলাপি রঙের প্রাচুর্য। চিত্রগ্রাহক লিওনর তেলেসের ক্যামেরা সেই সৌন্দর্যের ওপর ধীরে ধীরে স্থির হয়, যেন প্রতিটি রেশমি কাপড় ও সূক্ষ্ম নকশার মধ্যে কোনো গোপন গল্প লুকিয়ে আছে। কিন্তু পারলারের বাইরের ঢাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শহরের জরাজীর্ণ রাস্তা, পথবাসী, হকার ও শিশু ভিক্ষুকদের দৃশ্য সেই বিলাসী জগতের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে। রুবাইয়াতের সিনেমায় শ্রেণিবিভাজন বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ; এবারও গল্পের ভেতরে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় সেই বিভাজন।’
সিনেমাটির সঙ্গে কোরালি ফাজার আলোচিত ববি হরর সিনেমা ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’–এর তুলনা করে ইন্ডিওয়্যার আরও লিখেছে, ‘বিয়ের আগে জাইনিন (জাইনিন চৌধুরী) নিখুঁত জীবনকে আরও নিখুঁত করে তোলার চাপ বাড়তে থাকে। পারলারের ম্যানেজার চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধন অভিনীত চরিত্রটি জাইনিনের শরীরের প্রতিটি তথাকথিত ত্রুটি খুঁজে বের করেন। স্ট্রেচমার্ক, ত্বকের ছিদ্র—কোনো কিছুই তাঁর চোখ এড়ায় না। এরপর শুরু হয় ক্লান্তিকর সৌন্দর্যচর্চার এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ছবির সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুহূর্তগুলো তৈরি হয় এখানেই। কাটা মাংস, রক্তাক্ত নখ, গালে সুচ, রক্তের ইনজেকশন কিংবা ক্ষতবিক্ষত ত্বকের দৃশ্য—সব মিলিয়ে সৌন্দর্যের নামে শরীরের ওপর চালানো এক নির্মমতার ছবি তৈরি হয়। ক্রমশ দমবন্ধ হয়ে আসা পরিবেশ এবং শরীরকে নিখুঁত করে তোলার নির্মম চাপ মিলিয়ে এখানে দ্য সাবস্ট্যান্স–এর মিল পাওয়া যায়।’
সিনেমাটির কিছু সমালোচনাও করেছে ইন্ডিওয়্যার। লিখেছে, ‘সৌন্দর্য, শরীর, শ্রেণি, নারীর স্বাধীনতা এবং সামাজিক বৈষম্য—এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনার পরও ছবিটি শেষ পর্যন্ত সেগুলোর যথেষ্ট গভীরে যেতে পারেনি। জাইয়ের চরিত্র ও তার সংকটকে তুলনামূলক সহজ একটি সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে গল্পের শুরুতে যে জটিল প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছিল, তার অনেকগুলোই থেকে যায় উত্তরহীন।’ তবে সিনেমাটির কারিগরি দিকের প্রশংসা করেছে ইন্ডিওয়্যার।
‘রূপকথার বিয়ে যখন দুঃস্বপ্ন’ শিরোনামে সিনেমাটির রিভিউ করেছে আরেক অনলাইন গণমাধ্যম স্ক্রিন র্যান্ট। ‘নারীদের নেতৃত্বে তৈরি ছবিটি নারীর শরীরকে অন্য নারীরা কীভাবে দেখেন, বিচার করেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন—সেই জটিল প্রশ্নও সামনে আনে। পিতৃতন্ত্রের তৈরি “নিখুঁত সৌন্দর্য”র ধারণা নিজের অজান্তেই আত্মস্থ করেন অনেক নারী। ফলে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাটি শুধু পুরুষের মাধ্যমে কাজ করে না; অনেক সময় নারীরাই হয়ে ওঠেন সেই ব্যবস্থার বাহক,’ দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড সম্পর্কে লিখেছে গণমাধ্যমটি।
ছবিটির ইতিবাচক দিক উল্লেখ করে স্ক্রিন র্যান্ট লিখেছে, ‘ছবিটির বড় শক্তি তার ভিজ্যুয়াল। বাড়ি, গাড়ি আর বিউটি পারলারের ভেতরেই আবদ্ধ থাকে গল্পের বেশির ভাগ। প্রোডাকশন ও কস্টিউম ডিজাইনার জানকী ভট্টাচার্য এই সীমাবদ্ধ জায়গাগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যাতে পুরো পরিবেশটি এক “সোনার খাঁচা”র অনুভূতি তৈরি করে। রঙের তীব্র ব্যবহার, সমৃদ্ধ সাজসজ্জা, জমকালো জামদানি ও অলংকার—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক চোখধাঁধানো পৃথিবী। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভেতরেই রয়েছে বন্দিত্ব। চিত্রগ্রাহক লিওনর তেলেসের ক্যামেরা তুলে আনে নারীদের দ্বন্দ্ব, জটিলতা, সৌন্দর্য আর অবশ্যই অস্বস্তিকর অনুভূতি।’
ছবিতে সাপ, মৃত মাছ, রক্তে ভেজা শরীর, লাল জুতার ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া শামুক ইত্যাদি রূপকের ব্যবহারে বেশ কিছু পুনরাবৃত্তি আছে। তবে স্ক্রিন র্যান্টের সমালোচক মনে করেছেন, এগুলো চরিত্রটির দমবন্ধ অবস্থান আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে স্পষ্ট করে তোলে। ছবিটির অভিনয়শিল্পীদের প্রশংসা করে স্ক্রিন র্যান্ট লিখেছে, ‘সব অভিনয়শিল্পীই ভালো কাজ করেছেন। তবে জাইনিন চৌধুরী ও রিকিতা নন্দিনী শিমুই ছবির প্রধান ভরকেন্দ্র।’
আরেক ওয়েবসাইট ইন্টারন্যাশনাল সিনেফাইল সোসাইটি সিনেমাটির ভূয়সী প্রশংসা করেছে। পাঁচে সাড়ে চার স্টার দিয়ে লিখেছে, ‘সিনেমাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর অতিপ্রাকৃত উপাদানগুলো কখনোই জাইয়ের মনোজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয় না। তাঁর শরীর, চারপাশ ও মন ধীরে ধীরে একই ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। ফলে পর্দায় যা ঘটছে, তা বাস্তব, নাকি জাইয়ের মনের গভীর থেকে উঠে আসছে—সেই সীমারেখা ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যায়। আর এই অনিশ্চয়তাই সিনেমার ভয়ের আবহকে আরও কার্যকর করে।’
ছবিতে রূপকের ব্যবহারের প্রশংসা করে সমালোচক লিখেছেন, ‘টিকটিকি, শামুক, কেঁচো, সাপ কিংবা মৃত মাছ শুধু ভয় দেখানোর উপকরণ নয়। এগুলো জাইনিনের মানসিক পরিবর্তন, উদ্বেগ এবং চারপাশের পৃথিবীর প্রতি তাঁর ক্রমবর্ধমান অস্বস্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। এর মধ্যে শামুক সবচেয়ে বেশি মনে থাকে। চকচকে, পরিপাটি বিউটি স্যালনে ধীরগতির পিচ্ছিল শামুকের উপস্থিতি যেন পুরো পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্যালন এমন একটি জায়গা, যেখানে নারীর শরীরকে নির্দিষ্ট সৌন্দর্যের ধারণার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়। শরীরকে “নিখুঁত” করে তোলার চেষ্টা চলে সেখানে। শামুক তার সম্পূর্ণ বিপরীত—ধীর, জৈবিক, অগোছালো এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে শামুক হয়ে ওঠে এমন এক শরীরের প্রতীক, যাকে ইচ্ছেমতো সাজিয়ে, গুছিয়ে, অন্যের পছন্দমতো তৈরি করা যায় না। নারী শরীর নিয়ে সমাজের প্রত্যাশার গল্পে এটি নিঃশব্দ কিন্তু শক্তিশালী এক প্রতীক।’
আরও যা হলো ভেনিসে
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে যাত্রা শুরু করল গাজা সিনেমা একাডেমি। ফিলিস্তিনি, আরব ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান গাজার তরুণদের চলচ্চিত্র শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও নতুন সিনেমা নির্মাণের সুযোগ তৈরি করতে চায়। গত সোমবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে নতুন এই একাডেমির ঘোষণা দেওয়া হয়। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, গাজায় একটি টেকসই চলচ্চিত্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ফিলিস্তিনি নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
গাজা সিনেমা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বেশ কয়েকজন নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ২০২৫ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে রৌপ্য ভালুকজয়ী নির্মাতা এবং এবারের উৎসবের জুরি সদস্য কাউথার বেন হানিয়া। তাঁর আলোচিত সিনেমা ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ গাজার যুদ্ধের বাস্তবতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। উদ্যোক্তাদের আশা, এই একাডেমির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব হবে, যার মাধ্যমে গাজার নতুন নির্মাতারা শেখার সুযোগ পাবেন।
গত সোমবার উৎসবে প্রদর্শনীর পর প্রশংসা পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা লি চ্যাং-দংয়ের নতুন ছবি ‘পসিবল লাভ’। ২৪ বছর পর ভেনিসে ফিরে এসে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলেন নির্মাতা। ছবির প্রদর্শনী শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি অভিনয়শিল্পীরাও। ৬ মিনিটের করতালির মধ্যে কাঁদতে দেখা যায় জিওন দো-ইয়ন, সুল কিয়ং-গু, জো ইন-সুং ও চো ইয়ো-জিয়ংকে।